জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে জনগণের ঐক্য সুসংহত ও জনগণের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় এবং এর মূলনীতি অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জনের মাধ্যমে সামঞ্জস্যবাদ, নয়া উপনিবেশবাদ, সম্প্রসারণবাদ ও বর্ণবাদের অভিশাপ থেকে ঐক্যবদ্ধ জাতিকে মুক্ত করতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সংকলল্প বদ্ধ।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিশ্বাব করে যে, সচেতন জনতা সুবিধাবাদী দলগুলোর নেতিবাচক অগণতান্ত্রিক, স্থিতিশীলতার পরিপন্থী ও ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি প্রত্যাখ্যান করবে এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক মুক্তি হাসিল, জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সুসংহত করার স্বার্থে বিএনপি’র মনোনীত প্রার্থীকে ধানের শূষে ভোট দেবে। আমাদের পার্টি বিশ্বাস করে যে, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের সচেতনতার ভিত্তিতে সম্প্রদায়, ধর্ম ও শ্রেণী নির্বিশেষে জনতার সুদৃঢ় ঐক্যের মাধ্যমেই কেবলমাত্র জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা যেতে পারে। স্বাধীনতা লাভের পর থেকে ১৯৭৫ সালের শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে অরাজকতা চরমে পৌচেছিল। খুন, অপহরণ, লুটপাট ও অগ্মিসংযোগ ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের পর থেকে আমাদের জনগণ জান ও মালের নিরাপত্তা ফিরে পেয়েছে । আমরা এটা অব্যাহত রাখার জন্য অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে যাব।

প্রশাসনিক ব্যবস্থায় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহনের মাধ্যমে এবং জাতীয় অগ্রগতির স্বার্থে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ করে একপি পোষণ মুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠায় দৃঢ় সংকল্পের কথা আমরা ঘোষণা করছি। একই সঙ্গে আমরা ঔপনিবেশিক আমলের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় সংস্কার করে প্রশাসনকে গণমুখী করার প্রচেষ্ঠা অব্যাহত রাখব।

জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে আমাদের দল সম্প্রদায়, ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণী পুরুষ অথবা মহিলা নির্বিশেষে বাংলাদেশের সকল নাগরিকের সমান রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকারের কথা ঘোষণা করছে। জনগণের মৌলিক অধিকারকে বিচার বিভাগের আওতাধীন করা হবে।

আমরা প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির সরকার ও সংসদেও সার্বভৌমত্বে বিশ্বাসী। গত ৩রা জুনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জনগণও এ পদ্ধতির সরকারের অনুকূলে রায় দিয়েছে। জনগণের এ রায় বাস্তবায়িত করতে ও সমুন্নত রাখতে আমরা সংকল্পবদ্ধ।

১৮ই ফেব্রুয়ারীর সংসদ নির্বাচনেও জনগণ একই রায় দেবে বলে আমরা বিশ্বাব করি। আমরা বিশ্বাস করি যে কারিগরী ও বৃত্তিগত শিক্ষা সম্প্রসারণ ব্যতীত জাতির সমৃদ্ধি সম্ভব নয়। পর্যায় কমে ১৪ বছর বয়স অবধি বাংলা দেশীদের জন্য বাধ্যতামূলক শিক্ষা প্রবর্তনের ব্যবস্থা চালু হচ্ছে। প্রতিটি থানায় একটা করে কারিগরি ও কৃষি বিদ্যালয় থাকবে এবং প্রতিটি মহকুমায় কম করেও একটি কলেজ সরকারি তদারকিতে আনা হবে। মাদ্রাসাসমূহেও কারিগরি শিক্ষার ব্যবস্থা করা হবে। অন্যান্য ধর্মের লোকেরাও যাতে তাদের নিজেদের পছন্দ মোতাবেক তাদের নিজেদের ধর্মশাস্ত্র অধ্যায়ন করতে পারে তৎজ্জন্যও যথাযথ কার্যক্রম গৃহীত হবে। শিক্ষক সম্প্রদায়ের সার্বিক কল্যাণের জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া হবে। এসব পদক্ষেপ গ্রহণের সাথে সাথে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির উন্নয়ন সাধনেও ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

আমরা যথাশীঘ্র সম্ভব সারা দেশব্যাপী স্বাস্থের যত মৌলিক সুযোগ-সুবিধার সম্প্রসারণের জন্যও যথাসাধ্য চেষ্টা করবো। আয়ুর্বেদ, ইউনানী, হেকিমি ও অপরাপর দেশজ চিকিৎসা পদ্ধতির সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন সাধনেও আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করবো।

পল্লী ভিত্তিক ক্ষুদ্র শিল্প ও কুটির শিল্প প্রতিষ্ঠায় আমরা উদ্যোগ গ্রহণ করবো এবং জনগণের সাধারণ স্বাস্থ্য অবস্থার উন্নতি সাধনেও কার্যক্রম গ্রহণ করবো। আমরা প্রশাসনকে গ্রামমুখী করা প্রচেষ্টা নেব এবং বাস্তবমুখী ভূমি সংস্কার ব্যবস্থা গ্রহণ করে বাংলাদেশের সমৃদ্ধির পথ উন্মুক্ত করবো। প্রতি ইউনিয়নে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি সাধন করা হবে, প্রতি ইউনিয়নের একটা করে সাব-হেলথ সেন্টার থাকবে ও প্রতিগ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছবে।

ব্যাপক কৃষি সংস্কার ও প্রগতিশীল কৃষি নীতি প্রবর্তনের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন জোরদার করে আমরা দেশকে স্বনির্ভর করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। ভূমিহীন দরিদ্র কৃষকদের ভাগ্য পরিবর্তনে সকল প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণেও আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।

কৃষি ব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়ন সাধনের মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছর সময়কালের মধ্যে খাদ্য উৎপাদন কম করে দ্বিগুণ করতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সমবায় ব্যবস্থার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের স্বল্পোন্নত এলাকাসমূহের উন্নয়নের ব্যাপারে সক্রিয় কার্যক্রম গ্রহীত হবে ও বিশেষভাবে নজর দেওয়া হবে।

এ ব্যাপারে বিশ্বাব করি যে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি প্রাথমিকভাবে দেশের দ্রুত শিল্পায়নের ওপর নির্ভরশীল। দেশের নিজস্ব সম্পদের ওপর ভিত্তি করে আমাদের শিল্পনীতি গ্রণীত হবে। আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদরাজির যথাযথ ব্যবহারেরও নিশ্চয়তা বিধান করা হবে। মৌলিক ও ভারী শিল্প এবং মূল অর্থনৈতিক নীতির সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিরক্ষা-ভিত্তিক শিল্প রাষ্ট্রায়ত্ত খাতে থাকবে। এর বাইওে ব্যক্তি মালিকানায় শিল্প কারখানা প্রতিষ্ঠা ও উৎপাদনের ক্ষেত্রে পূর্ণ স্বাধীনতা থাকবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারী শিল্পের উন্নয়ন সাধন ও সংরক্ষণের জন্য আমরা সার্বিক সহযোগিতা ও সাহায্য দান অব্যাহত রাখবো। আমাদের জনগণ যাতে ন্যায়সঙ্গত মূল্যে শিল্প পণ্য ক্রয় করতে পারে তৎজ্জন্য আমরা সকল শিল্পদ্রব্যের মূল্য নির্ধারিত করে দেব।

পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ এবং ব্যবসা ও বাণিজ্যেও ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা আনয়নের জন্য সত্যিকারভাবে ব্যবসায়ে নিয়োজিত লোকদেও আমরা সব রকম সাহায্য প্রদান করবো। অত্যাবশ্যকীয় পণ্যদ্রব্যের সরবরাহের শিল্পায়নের বিষয় স্মরণ রেখে আমদানী নীতি প্রণীত হবে। এমন পদ্ধতিতে দেশের রফতানী নীতি প্রণীত হবে যাতে ক্রমান্বয়ে রফতানী আয় বাড়িয়ে দেশের বহিবাণিজ্যে সমতা আসে। শিল্প ইউনিট ও ব্যবসায়ীদের উদারভিত্তিক আর্থিক সাহায্য দেয়া হবে এবং দেশের রফতানী আয় বৃদ্ধির জন্য ব্যাংকিং সুবিধাদি প্রদত্ত হবে।

জাতীয় অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে ও জাতি গঠনে দেশের নারী সমাজ যাতে সক্রিয় ও কার্যকরভাবে তাদের ভূমিকা পালন করতে পারে তৎজ্জন্য আমরা আমাদের সার্বিক প্রচেষ্ঠা অব্যাহত রাখবো। আমরা বিশ্বাস করি যে, দেশ ও জাতির সার্বিক কল্যাণের জন্য নারীসমাজের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠা একান্তভাবে অপরিহার্য।

আমরা উৎপাদনমুখী রাজনীতি ও দেশের অর্থনৈতিক কর্মখান্ডে যুব সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে জাতীয় অগ্রগতির গতিধারাকে অব্যাহত রাখবো। সারাদেশে বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিল্প প্রবর্তন করে বেকার সমস্যার সমাধানের পদক্ষেপ নেয়া হবে।

আমরা মনে করি, জনসংখ্যা সমস্যাই দেশের এক নম্বর সমস্যা। বিপুল জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে পরিণত করা হবে। পঙ্গু লোকদের কর্মসংস্থানের সকল প্রচেষ্ঠা চালানো হবে। অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদের পেনসনভাতা বৃদ্ধি করা হবে।

বিএনপি’র ঘোষণাপত্রে আরো বলা হয়, মুক্তযোদ্ধাদের জাতীয় বীরের মর্যাদা দেয়া হবে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে তারা যেন সমস্যার সম্মুখীন না হন, সেজন্য মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টকে আরো অর্থ দেয়া হবে।

আমরা যেকোন সামাজিক অনাচার, অবিচার ও বৈষম্য বন্ধ করতে বদ্ধপরিকর। জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের অতন্দ্র প্রহরী বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীকে আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় সুসজ্জিত করে দেশের প্রতিরক্ষাকে আরো জোরদার কার হবে। আমাদের প্রিয় সশস্ত্র বাহিনী যাতে সকল পেশাগত ও যুক্তিসঙ্গত সুবিধাদি লাভ করতে পারে সে জন্য আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যাবো।

বাংলাদেশের জনগণ আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ও সংঘর্ষের বিরোধী। আমরা এমন এক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করব যাতে জনগণের আশা আকাংখা প্রতিফলিত হবে এবং স্বাধীনতার সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে সামোর স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে। অন্যদেশ ও জাতির অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করার নীতিতে আমরা অটল থাকব। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের রক্ষা করে সকল দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা সম্প্রসারণই আমাদের পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য।

এখন জনগণের নিজেদের রায় জানানোর ক্ষমতা রয়েছে। জনগণের আশা আকাংখা পূরণের ঘোষিত কর্মসূচি বাস্তবায়নে বিএনপি সক্ষম হবে কিনা তা জনগণই নির্ধারণ করবে। কিন্তু আমাদের দৃঢ় বিশ্বাব রয়েছে যে, বাংলাদেশের সচেতন জনতা অতীতের মত এবার ও নৈতিবাচক রাজনীতির শিকার না হয়ে সার্বভৌমের সংসদের জন্য ১৮ই ফেব্রুয়ারীর আসন্ন নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের ভোট দিয়ে বাংলাদেশকে একটি সুখী, শক্তিশালী, সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে গড়ে তোলার মহান কাজ শরীক হবে।