(বিএনপি কমিউনিকেশন) — Full Text of BNP Secretary General Mirza Fakhrul Isalm Alamgir’s Press Conference on Gas Price Hike held on 23rd February, 2017 at BNP Chairpersons Office at Gulshan
দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বৃদ্ধির সরকারি সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি’র বক্তব্য

প্রিয় সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা,

আসসালামু আলাইকুম,
২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে জ্বালানির আমদানি-ব্যয় হ্রাস সমন্বয় ছাড়াই গ্যাসের দাম একদফা বাড়ানো হয়। সে সময় এই বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল ভারিত গড়ে ২৬ শতাংশ। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় মাত্র ১০ মাসের ব্যবধানে আবারও গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব আসে। গত আগস্ট/২০১৬ বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের শুনানিতে অধিকাংশ অংশীমহল (stakeholder) এই দাম বৃদ্ধির বিরোধিতা করে। অংশীমহলের তথ্যভিত্তিক বক্তব্যে প্রমাণ হয় যে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির আদৌ কোন যৌক্তিকতা নেই। আমরা আশা করেছিলাম নতুন করে দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব আর উত্থাপন করা হবে না। কিন্তু আজ অপরাহ্নে মাত্র ১৮ মাসের ব্যবধানে সরকার পুনরায় গ্যাসের দাম বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে।
২। BERC সূত্র সংবাদপত্রগুলোকে নিশ্চিত করেছিল, ডিসেম্বর ২০১৬ এর শেষ সপ্তাহে পুনঃশুনানি অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু কোন শুনানি হয়নি। গণমাধ্যম সুত্রে জানা গেছে, গ্যাসের দাম দুই ধাপে বাড়ছে ৩০০ টাকা। আবাসিক গ্রাহকদের আগামী ১ মার্চ থেকে এক চুলার জন্য মাসে ৭৫০ টাকা এবং দুই চুলার জন্য ৮০০ টাকা দিতে হবে, যা এতোদিন ছিল যথাক্রমে ৬০০ টাকা ও ৬৫০ টাকা আর দ্বিতীয় ধাপে ১ জুন থেকে এক চুলার জন্য মাসিক বিল ৯০০ টাকা এবং দুই চুলার জন্য ৯৫০ টাকা হবে।
যানবাহনে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাসের (সিএনজি) দাম ১ মার্চ থেকে হবে প্রতি ঘনমিটারে ৩৫ টাকা থেকে বেড়ে ৩৮ টাকা হবে। আর ১ জুন থেকে হবে ৪০ টাকা।

অপরদিকে অন্য খাতে গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটারে হবে –

খাত বর্তমান মূল্য মার্চ থেকে                           জুন থেকে দুই ধাপে বাড়ছে
বিদ্যুত খাত ২ টাকা ৮২ পয়সা ২ টাকা ৯৯ পয়সা ৩ টাকা ১৬ পয়সা ১২.০৬%
ক্যাপটিভ পাওয়ার ৮ টাকা ৩৬ পয়সা ৮ টাকা ৯৮ পয়সা ৯ টাকা ৬২ পয়সা ১৫.০৭%
সার ২ টাকা ৫৮ পয়সা ২ টাকা ৬৪ পয়সা ২ টাকা ৭১ পয়সা ৫.০৪%
শিল্প

 

৬ টাকা ৭৪ পয়সা

 

৭ টাকা ২৪ পয়সা

 

৭ টাকা ৭৬ পয়সা

 

১৫.১৩%
চা বাগান ৬ টাকা ৪৫ পয়সা ৬ টাকা ৯৩ পয়সা ৭ টাকা ৪২ পয়সা ১৫.০৪%
বানিজ্যিক

 

১১ টাকা ৩৬ পয়সা

 

১৪ টাকা ২০ পয়সা

 

১৭ টাকা ০৪ পয়সা

 

৫০%
সি এন জি ৩৫ টাকা ৩৮ টাকা ৪০ টাকা ১৪.২৯%

গৃহস্থালি কাজে ব্যবহৃত গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি

ক) মিটার ভিত্তিক ৭ টাকা ৯ টাকা ১০ পয়সা ১১ টাকা ২০ পয়সা ৬০%
খ) এক বার্নার (মাসিক) ৬০০ টাকা ৭৫০ টাকা ৯০০ টাকা ৫০%
গ) দুই বার্নার (মাসিক) ৬৫০ টাকা ৮০০ টাকা ৯৫০ টাকা ৪৬.১৫%

সর্বশেষ ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে গ্যাসের দাম গড়ে ২৬ দশমিক ২৯ শতাংশ বাড়িয়েছিল শেখ হাসিনার সরকার। গ্যাসের দাম বাড়ানোর জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন বিতরণ কোম্পানির প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ৭ থেকে ১৮ আগস্ট পর্যন্ত গণশুনানি করে বিইআরসি। কিন্তু গনশুনানিতে উপস্থাপিত যুক্তিকে সরকার গ্রাহ্যই করেনি।
৩। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন দাম বাড়ানোর কারণ হিসেবে আই ও সি গ্যাসের মূল্য পুনঃনির্ধারণের বিবেচনা, জ্বালানি ঘাটতি মোকাবেলা, জ্বালানি খাতের উন্নয়ন, নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়ন, সম্পূরক শুল্ক ও মূল্য সংযোজন করের পরিমাণ বৃদ্ধির যুক্তি দেখালেও ভোক্তা প্রতিনিধি ও ব্যবসায়ী নেতাদের পাল্টা যুক্তির জোয়ারে ঐ দাবি ধোপে টিকেনি। তবুও সরকার গ্যাসের দাম বাড়াবার গণবিরোধী সিদ্ধান্তে অনড় রয়েছে।

প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ,

৪। আইওসি’র গ্যাস ক্রয় মার্জিন ৩ শতাংশ বৃদ্ধিজনিত ঘাটতি সমন্বয়ের জন্য গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির যুক্তি অন্তঃসারশূণ্য। কারণ দাম বৃদ্ধিজনিত অর্থ থেকে সরকার পাবে ৮১.১ শতাংশ (তন্মোধ্যে শুল্ক ও ভ্যাট ৫৫%, লভ্যাংশ ২%, কর্পোরেট কর ৩%, সম্পদ মূল্য মার্জিন ১৫.৯৬% এবং জিডিএফ মার্জিন ৫.১৪%)। বাদবাকি ১৯.৯ শতাংশ থেকে যাবে আইওসি গ্যাস ক্রয় মার্জিন ৩ শতাংশ বৃদ্ধিতে (বিদ্যমান ১৪%)। এর মধ্যে ৫ শতাংশ যেতে পারে উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ কোম্পানিগুলোর মার্জিন বৃদ্ধিতে। উদ্বৃত্তাংশ সম্পদ মূল্য মার্জিনে সমন¦য় হয়ে সম্পদমূল্য হিসাব থেকে যাবে পেট্রোবাংলার হাতে। প্রস্তাবিত দাম বৃদ্ধিজনিত অর্থের এমন বিভাজন গণশুনানিতে অনৈতিক ও অন্যায্য বলে অভিহিত হয়েছে। জিডিএফ মার্জিন বৃদ্ধিজনিত ৩ শতাংশের বিপরীতে পেট্রোবাংলাকে বছরে ৭৩৪ কোটি ৭৯ লক্ষ টাকা তুলতে হবে। এই বাবত আহরিত অর্থ হতে মার্জিন জনিত অর্থ বাদ দিলে পেট্রোবাংলার হাতে থাকবে অতিরিক্ত ১০৭৪৭ কোটি ৯২ লক্ষ টাকা। কিন্তু এ অর্থের পরিমাণ আরও অনেক বেশি হতে পারত। বিএনপি’র আমলে ২৩ নভেম্বর ১৯৯৩ তারিখে রাজস্ব বোর্ডের প্রজ্ঞাপন (২২৭ নম্বর ঝজঙ) অনুসারে বিদেশী কোম্পানি তথা ওঙঈ’র গ্যাসকে শুল্ক- ভ্যাটমুক্ত করা হয়। অথচ এখন সেই গ্যাসকে শুল্ক-ভ্যাটযুক্ত গণ্য করে সরকারের নির্দেশনা মতে পেট্রোবাংলা গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব করে। যার অভিঘাত ভোক্তাদের উপর পড়বে। এ অযৌক্তিক প্রস্তাব মানতে গিয়ে একদিকে গ্যাস খাত উন্নয়ন ব্যহত হচ্ছে, অন্যদিকে জনগণের উপর বর্ধিত দামের বোঝা চাপানো হচ্ছে। আসলে সরকার রাজস্ব ঘাটতি পূরণ করতে গিয়ে দিগি¦দিক জ্ঞানশূণ্য হয়ে সকল ক্ষেত্রে করের বোঝা বৃদ্ধির অপচেষ্টায় মেতে উঠেছে।

প্রিয় সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা,

৫। উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ কোম্পানিগুলোর মধ্যে অনেক কোম্পানিরই চাহিদার তুলনায় রাজস্ব উদ্বৃত্ত রয়েছে। অর্থাৎ গ্যাস কোম্পানিগুলো লাভজনক পর্যায়ে আছে। যে দু’একটি কোম্পানির ঘাটতি রয়েছে তার পরিমাণ অতি নগণ্য বিধায় এ পর্যায়ে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি মোটেই যুক্তিসংগত নয়। বলা হচ্ছে উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানির কারণে গ্যাসের সরবরাহ ব্যয় আগামীতে বাড়বে। কিন্তু এজন্য গ্যাসের আগাম দাম বৃদ্ধির আইনে কোন সুযোগ নেই। গণশুনানিতে অগ্রহণযোগ্য প্রমানিত হলেও উচ্চমূল্যে আগামীতে এলএনজি আমদানির অজুহাতে সরকার আবারও গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি করতে চাচ্ছে।

প্রিয় সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা,

৬। সরকার চুলা প্রতি গ্যাসের দাম প্রায় দ্বিগুণ করেছে। সিএনজির দামও বৃদ্ধি করেছে ১৪.২৯%। এলপিজি দামের সাথে সমতা আনার লক্ষ্যে, বিশেষ করে, বাংলাদেশে এলপিজির বাজার তৈরি করার জন্যই তথাকথিত এ দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকার-ঘনিষ্ঠ কয়েকটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে অতিরিক্ত লাভ পাইয়ে দিতেই এ আয়োজন করা হচ্ছে। অথচ বাস্তবে এলপিজির আমদানি ব্যয় অনেক হ্রাস পেয়েছে। ২০০৯ সালে ইঊজঈ সিলিন্ডার প্রতি এলপিজির দাম হার ১০৫০ টাকা থেকে প্রথমে ৮৫০ টাকা এবং পরে ৭০০ টাকা নির্ধারণ করে। পরিতাপের বিষয় হলো এ দাম হার বজায় থাকা সত্ত্বেও বাজার ভেদে সিলিন্ডার প্রতি এলপিজির দাম এখন ১০০০ থেকে ১১০০ টাকা। অথচ বিশেষজ্ঞদের মতে যৌক্তিক মুনাফাসহ সিলিন্ডার প্রতি এলপিজির দাম হওয়া উচিত ৪৫০ টাকা। এলপিজির দাম যৌক্তিক পর্যায়ে না নামিয়ে উল্টো সিলিন্ডার প্রতি ৩০০ টাকা ভর্তুকি প্রদানের কথাও বলা হচ্ছে সরকারী আশীর্বাদপুষ্ট ব্যক্তি খাতকে লাভবান করার জন্য। সরকারের আনুকূল্যপুষ্ট মুষ্টিমেয় ব্যবসায়ীকে এলপিজি আমদানির সুযোগ করে দিয়ে এ ক্ষেত্রে একটি ‘লাইসেন্স-রাজ ’ প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। এর ফলে প্রতিযোগিতাহীন বাজারে কিছু মুখচেনা ব্যক্তি অনার্জিত মুনাফা গুনবে এবং জনগণ শোষণের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত হবে। উপরন্তু সরকারের তরফ থেকে বলা হচ্ছে গৃহস্থালীতে নতুন আর কোন গ্যাস সংযোগ দেয়া হবে না যা এ অবাঞ্ছিত পরিস্থিতিকে নিঃসন্দেহে আরো ভয়াবহ করে তুলবে।

প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ,

৭। গ্যাস উন্নয়ন তহবিলে (GDP) ভোক্তারা বছরে জমা করে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা; সুদসহ এরই মধ্যে এ ফান্ডে জমা হয়েছে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা। সরবরাহকৃত গ্যাসে দেশীয় কোম্পানির গ্যাসের অংশ যেন বৃদ্ধি পায় এবং সরবরাহ ব্যয় যেন নিয়ন্ত্রণে থাকে, সে উদ্দেশ্যে এ ফান্ড গঠিত হয়েছিল। এ ফান্ড গঠনের পূর্বে সরবরাহকৃত গ্যাসে দেশীয় কোম্পানির অংশ ছিল ৫২ শতাংশ এবং আইওসি’র ৪৮ শতাংশ। পেট্রোবাংলার ভাষ্য মতে এউঋ আহরিত অর্থে বহু প্রকল্প হয়েছে, হচ্ছে এবং হবে। এ প্রকল্প গহণ ও বাস্তবায়নের দাবি করা হলেও এখন দেশীয় কোম্পানির গ্যাসের অংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৪০ শতাংশ, আর আইওসি’র অংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৬০ শতাংশ । অপরদিকে পেট্রোবাংলা এউঋ এর আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যাংকে ঋউজ হিসেবে অলস ফেলে রেখেছে। এখন আবার সরকার নতুন আইন করছে যাতে এউঋ এর অর্থ খনিজ সম্পদ উন্নয়নের নামে গ্যাস সেক্টরের বাইরে ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হয়। অথচ এ অর্থ ব্যয় করার কথা নতুন গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কার ও গ্যাস আহরণের জন্য। আমাদের দেশে স্থলভাগ ও সমুদ্রে প্রচুর গ্যাসের মজুত রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। আবিষ্কৃত গ্যাসের মজুত দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার অশনি সঙ্কেতের পরিপ্রেক্ষিতে নতুন গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কার ও আহরণের বিকল্প নেই। পেট্রোবাংলাসহ গ্যাস কোম্পানিগুলোর অবচয় তহবিল, বার্ষিক উদ্বৃত্ত আয় ও এউঋ মিলে প্রায় ২৪ হাজার ৯শ কোটি টাকা অলস পড়ে আছে মর্মে জানা যায় (সমকাল : ৫-৯-২০১৬)। তাই আমরা মনে করি এ মুহূর্তে গ্যাসের দাম না বাড়িয়ে সরকারের বরং এদিকে বেশি নজর দেয়া উচিৎ।

প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ,

৮। সরকার দাবি করে যে তারা সেবা ও সুযোগসুবিধায় সমতা নিশ্চিত করতে চায়। অথচ বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম হ্রাস পাওয়া সত্ত্বেও সরকার দীর্ঘদিন অতীতের উচ্চহারেই জ্বালানি তেল বিক্রয় অব্যাহত রাখে। কয়েক মাস আগে জ্বালানি তেলের দাম সামান্য নিম্নমুখী করা হলেও সার্বিকভাবে জ্বালানি তেলের দামের সঙ্গে গ্যাসের দামের সমন্বয় করা হয়নি। উপরন্তু গ্যাস ও সিএনজির দাম দফায় দফায় বাড়িয়ে সরকার তাদের রাজস্ব ও মুনাফা বাড়িয়ে চলেছে যার অভিঘাতে নিম্ন আয়ের মানুষ বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছে এবং শিল্পখাত ঝুঁকির মধ্যে পড়তে যাচ্ছে। বর্তমান আবাসিক চুলার সংখ্যা ৩৪ লক্ষ ১৩ হাজার ৬৪৩। অধিকাংশই দুই বার্নারের চুলা। ইঊজঈ এর গণশুনানিতে অভিযোগ করা হয়েছে, চুলা প্রতি ৯২ ইউনিট গ্যাস খরচ দেখিয়ে বিল নেয়া হয় ৬৫০ টাকা, অথচ প্রকৃত খরচ হয় ৪২.৪৫ ইউনিট। এ ভারসাম্যহীনতা নিরসনের কোন উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। গ্যাসের কাম্য চাপ না থাকায় নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে। ফলে গৃহিনীরা পড়েছেন চরম দুর্ভোগে। এ পরিস্থিতিতে গ্যাসের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ গণবিরোধী।
৯। আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর গ্যাস উৎপাদন ও সরবরাহ বৃদ্ধির জন্য অনেক প্রকল্প হাতে নেবার কথা বলেছিল। গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি খাতে প্রচুর অর্থ ব্যয় করা হয়েছে বলে জানা যায়। দুঃখের বিষয় বাস্তব পরিস্থিতি স¤পূর্ণ ভিন্ন। গ্যাস উৎপাদন ও সরবরাহ বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য কোন অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়।

প্রিয় সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা,

১০। গ্যাসের অপ্রতুল সরবরাহ ও স্বল্প চাপ শিল্প খাতকে এমনিতেই চরম সঙ্কটে ফেলেছে। এর ফলে পোশাক ও বস্ত্র খাতসহ সার্বিক শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যহত হচ্ছে এবং এরা উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির শিকার। এ অবস্থায় সরকার শিল্প খাতে ক্যাপ্টিভ পাওয়ারের ক্ষেত্রে ১৫.০৭% এবং অন্যান্য শিল্প ক্ষেত্রে ১৫.১৩% গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি করেছে। প্রধানতঃ গার্মেন্টস, পোশাক, ঔষধশিল্প ক্যাপ্টিভ পাওয়ার থেকে এবং স্পিনিং, কেমিক্যাল, ডায়িং, পেপার শিল্পসহ অন্যান্য শিল্প গ্যাস লাইন থেকে সরাসরি গ্যাস ব্যবহার করে থাকে। পোশাক শিল্পের সিংহভাগ সূতা ও কাপড় যোগান দিচ্ছে backward linkage হিসেবে গড়ে উঠা দেশীয় বস্ত্র কারখানাগুলো। প্রস্তাবিত দর বৃদ্ধি কার্যকর হলে সূতা কিংবা বস্ত্র উৎপাদন খাত দারুণ ধাক্কা খাবে। আমাদের গার্মেন্ট সেক্টরসহ অন্যান্য শিল্প পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও চীনের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে। আর এইসব শিল্পে কর্মরত লক্ষ লক্ষ শ্রমিক বেকার হয়ে পড়বে। যার নেতিবাচক প্রভাব সামাজিক নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে পড়তে বাধ্য। আর তাই শিল্পখাতে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করা যাবেনা।

প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ,

১১। সরকার ও পেট্রোবাংলার বিরুদ্ধে ওঙঈ’র গ্যাস ক্রয়ে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে দেখা যায় ব্যয় উসুল, কম্প্রেসার স্থাপন ও পরিচালনা, গ্যাসের দাম পরিশোধে ডিসকাউন্ট সুবিধা না নেয়া, যন্ত্রপাতি আমদানি, এসব ব্যাপারে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে পেট্রোবাংলা অভিযুক্ত। তার ওপর সম্প্রতি বঙ্গোপসাগরে গ্যাস অনুসন্ধানে বিনা টেন্ডারে একটি বিদেশী কোম্পানিকে কাজ দেয়া নিয়েও কথা উঠেছে। এদিকে ওগঊউ তিতাস গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ কোম্পানির বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ এনেছে। তারা বলছে ত্রুটিপূর্ণ মিটার, মিটার টেম্পারিং, গ্যাস অপচয় ও অবৈধ সংযোগের কারণে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে (বণিকবার্তা- ১১.১২.১৬)। সংসদীয় কমিটির কাছে পেশকৃত এক প্রতিবেদনে জানা যায় যে, তিতাস গ্যাস কোম্পানির গেল ছয় বছরের হিসাবে ৩ হাজার ১৩৮ কোটি ৩৮ লক্ষ টাকার গরমিল রয়েছে। তিতাসের সর্বশেষ বার্ষিক অডিট রিপোর্টে অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে ৪৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের তথ্য বেরিয়ে এসেছে। একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে দেখা যায় যে কেবলমাত্র নরসিংদী -নারায়নগঞ্জ-গাজীপুরে ৬০০ কি:মি: অবৈধ গ্যাস লাইনের মাধ্যমে দৈনিক ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস চুরি করা হয় (যায়যায় দিনঃ ১৮-৮-১৬)। তাছাড়া বিপুল পরিমাণ গ্যাস অপচয় হচ্ছে। জাইকা’র তথ্য অনুযায়ী ২০১৩-১৪ অর্থবছরে কেবলমাত্র গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ খাতে অপচয় হয় ৫২০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস যা দিয়ে ১৩০০ মেগাওয়াট একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানো সম্ভব (বণিকবার্তাঃ ২৭ -১২-১৬)। তাছাড়া ক্যাপ্টিভ পাওয়ার উৎপাদনেও বিপুল পরিমাণ গ্যাস অপচয় হয়, জাইকার মতে যার হার ৭%।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৬ এর তথ্য অনুযায়ী ২০১৩-১৪ অর্থবছরে সার উৎপাদন খাতে অপচয়ের পরিমাণ ২৩২৩ কোটি ঘনফুট, এবং ২০১৫-১৬ সালে ১১২৭ কোটি ঘনফুট। জাইকার প্রতিবেদন অনুসারে আন্তর্জাাতিক মান অনুযায়ী প্রতি টন সার উৎপাদনে ২৪-২৫ হাজার ঘনফুট গ্যাস ব্যবহার হওয়ার কথা। আমাদের দেশে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান “কাফকো”তে প্রতি টন সার উৎপাদনে ২৪ হাজার ঘনফুট গ্যাস খরচ হয়। অন্যদিকে বাংলাদেশের সরকারী সার কারখানাগুলোতে প্রতি টন সার উৎপাদনে গ্যাস খরচ হয় ৪০-৫০ হাজার ঘনফুট। গ্যাস অপচয়ের প্রধান কারণ জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতার অভাব এবং পুরাতন যন্ত্রপাতি নিয়মিতভাবে ওভারহলিং না করা। গ্যাসের মূল্য না বাড়িয়ে দক্ষতা বৃদ্ধি করে এবং পুরাতন যন্ত্রপাতি ওভারহলিং করে গ্যাসের অপচয় বন্ধ করাটাই প্রাধান্য পাওয়া উচিৎ।

প্রিয় সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা,

১২। বর্তমান সরকার গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে বাপেক্সসহ অন্যান্য জাতীয় কোম্পানিগুলোর সক্ষমতা উন্ন্য়নের জন্য কিংবা নতুন গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কার ও আহরণের কোন কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করেনি। পাশ্ববর্তী মিয়ানমার সমুদ্র থেকে গ্যাস উত্তোলন শুরু করেছে, অপরদিকে আমরা সমুদ্রে এখনো অনুসন্ধানই শুরু করতে পারিনি। অথচ বাংলাদেশ সরকার নতুন গ্যাস ফিল্ড আবিষ্কার না করে এলএনজির আমদানির উপর অধিকতর গুরুত্ব দিচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ হতে হলে আমাদের এনার্জি সেক্টরকে বহুমুখী করতে হবে। অথচ বর্তমান সরকার প্রায় সব ক্ষেত্রে জ্বালানি সমস্যা নিরসনের জন্য আমদানিনির্ভর নীতি গ্রহণ করেছে। এ জন্য কয়লা, এলএনজি, ফার্নেস অয়েলসহ বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি আমদানি করছে। এর ফলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা প্রচন্ড হুমকির মুখে পড়বে। দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানি উন্ন্য়নের জন্য সর্বাত্মক প্রয়াস নিতে হবে।

প্রিয় সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা,

১৩। সরকার এক বছরের মধ্যে আবারও গ্যাসের দাম বাড়াতে যাচ্ছে। এটা শুধু অযৌক্তিকই নয়, নৈতিকতা বিরোধীও। এ পর্যায়ে গ্যাসের দাম বাড়ালে অর্থনীতি হোঁচট খাবে। রফতানিমুখী পোশাক খাত, বস্ত্র খাতসহ সার্বিক শিল্পখাতে উৎপাদন ভয়াবহ সংকটে পড়বে। কোটি কোটি টাকা জামানত দিয়েও নতুন গ্যাস-সংযোগ পাওয়া যাচ্ছে না। এতে নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে না। এ পর্যায়ে গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে চালু কলকারখানাগুলোও বন্ধ হয়ে যাবে। বেড়ে যাবে পরিবহণ ভাড়া। চাপে পড়বে গরীব জনসাধারণ।
বিশ্ববাজারে জ্বালানী তেলের দরপতনের সাথে যৌক্তিক সমন্বয় করে সরকার জ্বালানী তেলে অস্বাভাবিক মুনাফা অর্জন অব্যাহত রাখায় গত সেপ্টেম্বরে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে। গত বছর একবার গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে। এক বছরের মাথায় এখন আবার গ্যাসের দাম বাড়লে এত অল্প সময়ের মধ্যে বিদ্যুতের দাম আবারও বাড়ানো হতে পারে। সরকারের প্রতিশ্রুতি ছিল ২০১৪ সাল নাগাদ সরকার বিদ্যুতের মূল্যহার কমিয়ে আনবে। সে ব্যাপারে একটি রোড-ম্যাপও ছিল। কিন্তু সরকার সে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। সরকার অগ্রসর হয়েছে বল্গাহীনভাবে রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্যে লাভ ও লোভের রোড-ম্যাপ ধরে। জনগণকে জিম্মি করে রাজস্ব আহরণের এমন কৌশল নিঃসন্দেহে গণবিরোধী। গ্যাসের দাম এইভাবে বৃদ্ধি করা হলে অর্থনীতির সব খাতই যেমন- শিল্প, কৃষি, পরিবহণ প্রভৃতি দারুণ বিপর্যয়ের মধ্যে পড়বে-অর্থনীতির এ খাতগুলো প্রচন্ড Shock এর মুখোমুখি হবে।

প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ,

১৪। এ কথা সঠিক পাকিস্তান আমলে প্রাকৃতিক গ্যাস আবিষ্কারের শুরু থেকেই উৎপাদন, সঞ্চালন, বিতরণ, মূল্য-নির্ধারণ বিষয়ে কোন বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনা ও কর্মকৌশল গৃহীত হয়নি। একটি ফবঢ়ষবঃধনষব ৎবংড়ঁৎপব এর ঢ়ৎরপরহম ধারাবাহিক ত্রুটি হঠাৎ করে দূর করা যায় না। সরকার সে পথেও হাঁটছে না। সরকারের একমাত্র লক্ষ্য রাজস্ব আয় বৃদ্ধি। বর্তমানে সরবরাহকৃত গ্যাসের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ গৃহস্থালির রান্না-বান্নার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। এসকল সাধারণ ভোক্তাকুলের স্বার্থ ও কল্যাণ বিবেচনায় রেখেই গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ করতে হবে।
গ্যাস ম্যানেজমেন্ট ও ব্যবহারে অদক্ষতা নিরসন করে, বিদ্যুৎ ও সারকারখানাগুলোর প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতির আধুনিকায়নের ভিত্তিতে অপচয় রোধ এবং সুশাসন নিশ্চিত করে বেআইনি সংযোগ তথা সিস্টেম লস বা গ্যাস চুরি প্রতিরোধের মাধ্যমে যে গ্যাস সাশ্রয় হবে সে অর্থ দিয়েই আইওসি ও স্থানীয় কোম্পানিগুলোর মার্জিনসহ বিবিধ খাতের ব্যয় সংকুলান করে বিপুল অর্থ উদ্বৃত্ত থাকবে। অথচ সরকার সেদিকে নজরই দিতে নারাজ।

প্রিয় সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা,

১৫। বর্তমান সরকারকে ক্ষমতাসীন হতে ও থাকতে জনগণের ভোটের প্রয়োজন হয়নি। এধরনের একটি সরকার জনগণের স্বার্থ বিবেচনায় নিবে না তা বলাই বাহুল্য। মোটা বাজেটের অর্থ যোগান দিতে জনসমর্থনহীন সরকার এখন জনগণের পকেট কেটে বল্গাহীন রাজস্ব আহরণের জন্য বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। আমরা গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধিতে সরকারের এহেন অনৈতিক, অযোক্তিক ও গণবিরোধী সিদ্ধান্ত বাতিলের জোর দাবি জানাচ্ছি। জনগণকে জিম্মি করে রাজস্ব আদায়ে সরকারের সিদ্ধান্ত জনগণ মেনে নেবে না।