(বিএনপি কমিউনিকেশন) — হাওর অঞ্চলে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে সরকারি ত্রাণ তৎপরতা একেবারেই অপ্রতুল এবং লোক দেখানো বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

তিনি বলেন, সরকার আবারো ‘একতরফা খেলা’র মাধ্যমে নির্বাচনি বৈতরণী পার হওয়ার ‘ষড়যন্ত্র’ করছে। ১/১১ সময়ে আওয়ামী লীগের সব মামলা তুলে নেয়া হয়েছে, বিএনপির প্রত্যেকটি মামলা আবার নতুন করে চালু করা হচ্ছে। এই সরকার রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে গেছে বলেই এই মামলা-মোকাদ্দমা করে  বিএনপিকে মোকাবিলা করতে চায়। আমরা সরকারকে বারবার বলেছি, আসুন না খোলা ময়দানে, সমান্তরাল ময়দানে একসাথে খেলি। নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য বিএনপির সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে। কিন্তু সেটার মধ্যে তারা নেই। তারা আমাদের সবাইকে জেলের মধ্যে ঢুকিয়ে রেখে দিয়ে তারা একতরফা খেলতে চায়। এই খেলা কখনোই এদেশের মানুষ গ্রহণ করবে না।

মঙ্গলবার নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

মির্জা ফখরুল বলেন, খোলাবাজারে চাল ও আটা বিক্রির কথা বলা হলেও তা দৃশ্যমান নয় এবং এ নিয়ে চরম দুর্নীতি হচ্ছে বলে শোনা গেছে। বর্তমান সরকার জনগণ দ্বারা নির্বাচিত নয় বলেই জনগণের প্রতি এদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই। আর সে কারণেই তারা হাওর অঞ্চলের জনগণের দুর্দশায় নির্বিকার। এপ্রিল মাসের ৪/৫ তারিখ থেকে উজান থেকে নেমে আসা পানির ঢল, অকাল, অতিবৃষ্টি এবং বিভিন্ন বাঁধ সংস্কার না করার ফলে ভেঙে যাওয়ায় নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ জেলার বিভিন্ন হাওর এলাকার লাখ লাখ হেক্টর জমির ফসল বিনষ্ট হয়। সাধারণত বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি সময়ে হাওর এলাকায় বন্যা হলেও এ বছর নির্দিষ্ট সময়ের আগে হাওর এলাকায় বন্যা হওয়ায় কৃষকরা তাদের বছরের একমাত্র ফসল হারিয়ে এখন দিশেহারা। এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সিলেট জেলার সাড়ে তিন লাখ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়েছে। যাতে প্রায় ১০ লাখ টন চাল উৎপাদন হতো। এসব জেলায় লাখ লাখ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে চরম মানবিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছে।  হাওর এলাকায় বন্যায় ফসল বিনষ্টের সংবাদে উদ্বিগ্ন হয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াবার জন্য নির্দেশ প্রদান করেন। পরবর্তীতে দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সভায়ও হাওর অঞ্চলের দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াবার জন্য দলের পক্ষ থেকে প্রতিনিধিদল প্রেরণের সিদ্ধান্ত হয়। তিনি বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসনের নির্দেশে আমি দলীয় নেতৃবৃন্দকে সাথে নিয়ে গত ১৫ এপ্রিল শনিবার নেত্রকোনা জেলার হাওর অঞ্চল পরিদর্শন করি। নেত্রকোনার ক্ষতিগ্রস্ত হাওর অঞ্চল পরিদর্শনে যাওয়ার সময় সুনামগঞ্জ জেলার ধরমপাশা উপজেলার বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি হাওরের কিছু অংশও পরিদর্শন করি। নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুড়ি, কলমাকান্দা, মদনসহ বিভিন্ন উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় হাওর অঞ্চলে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। পরিদর্শনকালে আমি নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ থেকে স্পিডবোট যোগে উপজেলার বিস্তীর্ণ হাওর এলাকার গাগলাজুড় বাজার, লিপ্সা বাজার, বোয়ালীবাজার, খালিয়াজুড়ি উপজেলার সদর ইউনিয়ন বাজারে নেমে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সাথে কথা বলি। তারা আমাকে জানিয়েছেন তাদের সম্পূর্ণ ফসল বিনষ্ট হওয়ায় তারা অর্ধাহার-অনাহারে অত্যন্ত মানবেতর অবস্থায় দিনযাপন করেছেন। সরকারি ত্রাণ তৎপরতা লোক দেখানো এবং অপ্রতুল। তারা কিভাবে খেয়ে পড়ে বাঁচবে। কিভাবে ঋণ পরিশোধ করবে, তা ভেবে অত্যন্ত মানবেতর দিন কাটছে। স্পিডবোট যোগে বিভিন্ন গ্রামের পাশ দিয়ে হাওর এলাকায় যাওয়ার সময় সেখান থেকে হাজার হাজার নারী-পুরুষ-শিশুর আহাজারিতে পরিবেশ ভারি হয়ে ওঠে। আমরা আমাদের সাধ্যমতো ত্রাণসামগ্রী দিয়েছি।’  বিএনপির এই নেতা বলেন, সাধারণত ব্যাংক ও বিভিন্ন এনজিওসহ মহাজনী ঋণ নিয়ে হাওর অঞ্চলের কৃষকরা তাদের ফসল উৎপাদন করে। এবার ফসল সম্পূর্ণ বিনষ্ট হওয়ায় ঋণের চাপে এবং পরিবার-পরিজনের অনিশ্চিত ভবিষ্যতে দুশ্চিন্তায় যেন তাদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে। নেত্রকোনায় এ পর্যন্ত একজন আত্মহত্যা এবং হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে একজনের মৃত্যুর খবরও পাওয়া গেছে। সরকারের প্রতি দাবি জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাকে অবিলম্বে দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবি জানাচ্ছি। প্রশাসনের উদ্যোগে দলমত নির্বিশেষে সকলকে নিয়ে কমিটি গঠনের মাধ্যমে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের নির্ভুল এবং দলীয় প্রভাবমুক্ত তালিকা করে আগামী ফসল না ওঠা পর্যন্ত ত্রাণ তৎপরতা চালানোর দাবি করছি। পুরনো কৃষিঋণ মত্তকুফ করার দাবি জানাচ্ছি।  আগামী ফসলের জন্য সুদবিহীন নতুন কৃষিঋণ দেয়ার দাবি জানাচ্ছি। আগামী ফসল উৎপাদনের জন্য কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে সার, বীজ, কীটনাশক, তেলসহ কৃষি উপকরণ দেয়ার দাবি জানাচ্ছি। এলাকায় তিগ্রস্ত বাঁধগুলো আগামী ফাল্গুন মাসের আগেই পুনঃনির্মাণ/সংস্কার করতে হবে। সেখানে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নিতে হবে। এখানে উল্লেখ্য যে, ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকারের আমলেই প্রথম সরকারিভাবে হাওর অঞ্চলে ফসল রক্ষার জন্য বাঁধ নির্মাণ করা হয়। এরপর থেকেই প্রতিবছর ফাল্গুন মাসের আগেই বাঁধগুলো সরকারি খরচে সংস্কার  করা হতো। কিন্তু এ বছর বাঁধগুলো দুর্নীতি ও লুটপাটের কারণে যথাযথভাবে সংস্কার না হওয়ায় উজানের পানির ঢলে দুর্বল বাঁধগুলো ভেঙে গিয়ে ফসল নষ্ট করে। একইভাবে আগামী বোরো ফসল ওঠার আগেই এলাকার নদীগুলোর যথাযথ ড্রেজিং করার দাবি জানাচ্ছি। ভারত থেকে আগত  বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ৫৪টি অভিন্ন নদীতে পানি প্রবাহের ন্যায্য চুক্তি করতে হবে। উজানে বাঁধ দিয়ে ভারত এসব নদীর পানি নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে পানি ছেড়ে দেয়ায় বাংলাদেশের ব্যাপক য়তি হচ্ছে। অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে পানি আটকিয়ে দিচ্ছে।’  বিএনপির নেতাকর্মীদের মুক্তির দাবি করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সাইদুর রহমান বাচ্চু, নাটোর জেলা বিএনপি নেতা বাবলু চেয়ারম্যান, আজিজুর রহমান মেম্বার এবং নওশাদ আলী মাস্টারসহ আটককৃত বিএনপি  নেতাকর্মীদের মুক্তির দাবি জানাচ্ছি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা উপজেলায় জাতীয়তাবাদী যুবদল ও ছাত্রদলের কর্মিসভায় পুলিশ বিনা উসকানিতে হামলা চালায়। পুলিশের লাঠিচার্জে যুবদলের সদস্যসচিব শরিফুল ইসলাম স্বপন, যুগ্ম আহবায়ক মনির হোসেন বাক্কু, রবিঊল হোসেন ও ছাত্রদল নেতা মাসুদুর রহমান দিপু, গোলাম মোস্তফাসহ ৩০ জনের অধিক নেতাকর্মী গুরুতর আহত হয়। এছাড়া নেতাকর্মীদের বহনকৃত মাইক্রোবাস, বাস, পিকআপ পুলিশ আটক করে থানায় নিয়ে যায়। এ হামলার নিন্দা জানাচ্ছি। সারাদেশে নতুন করে সরকার নেতাকর্মী-সমর্থকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিচ্ছে, গ্রেফতার করছে।

দমননীতির পথ পরিহার করার আহবান জানিয়ে বিএনপি মহাসচিব বলেন, আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, সরকারের শুভবুদ্ধির উদয় হওয়া উচিত। আমাদের দেশনেত্রীসহ নেতাকর্মীদের সব মামলা প্রত্যাহার করে একটা ত্রে প্রস্তুত করা উচিত যাতে করে আমরা শুধু নির্বাচন নয়, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে বিরোধী দল হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারি। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমরা নির্বাচনে যেতে চাই, তবে সে জন্য ত্রে প্রস্তুত করতে হবে। সকল দল যাতে নির্বাচনে অংশ নিতে পারে তার জন্য পরিবেশ তৈরি করতে হবে। আমাদের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে জেলে রেখে দেবেন, নেতাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেবেন- আর বলবেন যে তোমরা নির্বাচনে যাও। তাহলে আমরা নির্বাচনে কীভাবে যাব। আমরা বারবার বলছি, দেশে গণতন্ত্র নেই, গণতান্ত্রিক কোনো স্পেস বা জায়গা নেই। তাই আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, নিরপে সরকারের অধীনে, নিরপে নির্বাচন কমিশনের পরিচালনায় সুষ্ঠু নির্বাচনে হলে আমাদের নেতাকর্মীদের মুক্তি দিলে আমরা নির্বাচনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব। সকল দলের সমান সুযোগ ছাড়া নির্বাচনে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। ক্ষমতাসীনদের সাথে হেফাজতের ‘সখ্যে’র পরিপ্রেেিত দলের অবস্থান জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল বলেন, নারী বিদ্বেষসহ নানা বিতর্কিত ভূমিকার জন্য বিভিন্ন সময় সরকারের মন্ত্রীদের কাছে সমালোচিত হেফাজতে ইসলামের আমির শাহ আহমদ শফীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বৈঠক সরকারের ডাবল স্ট্যান্ডার্ড। আমাদের অবস্থান খুব পরিষ্কার। আমরা ডাবল স্ট্যান্ডার্ড করি না। আমরা কথায় এক রকম, আবার কাজে আরেক রকম, আওয়ামী লীগ যেটা সুন্দর পারে আর কী, পারছে। পিটিয়ে-পুটিয়ে বলে যে, আসো তোমাদের সাথে বন্ধুত্ব করি, ভালোবাসা করি। এগুলোর মধ্যে আমরা যাই না। আমরা সব সময় ন্যায়ের পে আছি, ন্যায়সঙ্গত দাবির প্রতি আছি। আমরা মনে করি যে, মাদ্রাসা শিাকে আধুনিক করা দরকার। বর্তমান পৃথিবীর উপযোগী তাদের চাহিদা অনুযায়ী, তাদের আমরা কাজে লাগাতে পারি, তারা যেন ওয়ার্কিং ফোর্স হিসেবে কাজ করতে পারে, সে জন্য তাদের শিা ব্যবস্থাকে গড়ে তুলতে চাই। এটাই আমাদের অবস্থান।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ফখরুল বলেন, আমরা পরিষ্কারভাবে আমাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছি যে, হেফাজতে ইসলাম তখন যে দাবি করেছিল, তার মধ্যে সবগুলো দাবি নয়, কিছু কিছু দাবি আমরা যুক্তিসঙ্গত মনে করেছিলাম, আমরা সেগুলোকে সমর্থন দিয়েছিলাম। যে কাজটা উনারা (বর্তমান সরকার) এখন করল বিরাট ঢাকঢোল পিটিয়ে হেলিকপ্টারে দিয়ে উনারা উড়িয়ে নিয়ে আসলেন, নিয়ে এসে গণতবনে মাওলানা শফীকে (শাহ আহমেদ শফী) এবং অন্যদের পাশে বসিয়ে সুন্দর করে খাবার-দাবার তুলে দিলেন। ভালো কথা। হসপিটালিটি- আমাদের বাঙালির একটা ঐতিহ্য, সুন্দর কথা। কিন্তু কী করলেন? যেটা অতীতে হয়ে গেছে। দওড়া হাদিস ডিগ্রি- এটা আমাদের সরকারের সময়ে গেজেট নোটিফিকেশন হয়ে গিয়েছিল, আপনারা (সাংবাদিক) নিশ্চয়ই জানেন সেটা। কপিও আছে আমাদের কাছে, এর স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল। এটাকে আবার নতুন করে বিভিন্নভাবে  করে তারা চেষ্টা করছেন, এখন তাদের সঙ্গে চেষ্টা করছেন একটা ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলবার।

এক প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ভুটানের সঙ্গে আমাদের একটা জরুরি বিষয় আছে সেটা হচ্ছে জলবিদ্যুৎ। আমাদের আগে প্রস্তাব ছিল, ট্রাই পা ট্রাই- নেপাল, ভুটান, ভারত ও চীন- এদের সঙ্গে চুক্তি করা দরকার ছিল। ভারত কখনো দ্বিপাকি ছাড়া কখনোই অন্য কোনো দেশকে আনতে চায়নি, ফলে টোটাল বিষয়টা করা সম্ভব হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর ভুটান সফর তখনই সফল হবে যদি দেখি ভারতের মতো উনি খালি হাতে ফিরে আসলেন, দিয়ে আসলেন সব কিছু- তখন সেটা আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।

সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সৈয়দ মো. আলমগীর ও আতাউর রহমান ঢালী, সাংগঠনিক সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, বিলকিস জাহান শিরিন, সাখাওয়াৎ হোসেন জীবন, সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, আইনবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, সহ- সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুস সালাম আজাদ, সহ-কৃষিবিষয়ক সম্পাদক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল ফারুক, কেন্দ্রীয় নেতা আবদুল বারী ড্যানি, রাবেয়া আলী, রফিকুল ইসলাম হেলালী, নেত্রকোনা জেলা সভাপতি আশরাফ উদ্দিন খান, সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুল হক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মির্জা হায়দার আলী, সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম মনিরুজ্জামান দুদু, ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক শরিফুল হাসান আরিফ প্রমুখ।

মঙ্গলবার, ১৮ এপ্রিল বেলা সোয়া ১১টার দিকে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

সম্পূর্ণ জরুরি সংবাদ সম্মেলনটি নিচে তুলে ধরা হলো-

আপনারা জানেন, এপ্রিল মাসের ৪/৫ তারিখ থেকে উজান থেকে নেমে আসা পানির ঢল, অকাল, অতিবৃষ্টি এবং বিভিন্ন বাঁধ সংস্কার না করার ফলে ভেঙ্গে যাওয়ায় নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ জেলার বিভিন্ন হাওড় এলাকার লক্ষ লক্ষ হেক্টর জমির ফসল বিনষ্ট হয়।

* সাধারণত বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি সময়ে হাওড় এলাকায় বন্যা হলেও এ বছর নির্দিষ্ট সময়ের আগে হাওড় এলাকায় বন্যা হওয়ায় কৃষকরা তাদের বছরের একমাত্র ফসল হারিয়ে এখন দিশেহারা।

* এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সিলেট জেলার সাড়ে তিন লক্ষ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণভাবে বিনষ্ট হয়েছে। যাতে প্রায় ১০ লক্ষ টন চাল উৎপাদন হতো। এসব জেলায় লক্ষ লক্ষ পরিবার ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে চরম মানবিক বিপর্যয়ের সম্মুখিন হচ্ছে।

* হাওড় এলাকায় বন্যায় ফসল বিনষ্টের সংবাদে উদ্বিগ্ন হয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের পাশে দাঁড়াবার জন্য নির্দেশ প্রদান করেন। পরবর্তীতে দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সভায়ও হাওড় অঞ্চলের দুর্দাশাগ্রস্থ মানুষের পাশে দাঁড়াবার জন্য দলের পক্ষ থেকে প্রতিনিধি দল প্রেরণের সিদ্ধান্ত হয়।

* বিএনপি চেয়ারপার্সনের নির্দেশে আমি দলীয় নেতৃবৃন্দকে সাথে নিয়ে গত ১৫ এপ্রিল, ২ বৈশাখ, রোজ শনিবার নেত্রকোনা জেলার হাওড় অঞ্চল পরিদর্শন করি। নেত্রকোনার ক্ষতিগ্রস্থ হাওড় অঞ্চল পরিদর্শনে যাওয়ার সময় সুনামগঞ্জ জেলার ধরমপাশা উপজেলার বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্থ কয়েকটি হাওড়ের কিছু অংশও পরিদর্শন করি।

* নেত্রকোণা জেলার মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুড়ি, কলমাকান্দা, মদনসহ বিভিন্ন উপজেলার বিস্তির্ণ এলাকায় হাওড় অঞ্চলে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে।

* পরিদর্শনকালে আমি নেত্রকোণার মোহনগঞ্জ থেকে স্পিডবোটযোগে উপজেলার বিস্তির্ণ হাওড় এলাকার গাগলাজুড় বাজার, লিপ্সা বাজার, বোয়ালীবাজার, খালিয়াজুড়ি উপজেলার সদর ইউনিয়ন বাজারে নেমে ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের সাথে কথা বলি। তারা আমাকে জানিয়েছেন তাদের সম্পূর্ণ ফসল বিনষ্ট হওয়ায় তারা অর্ধহারে-অনাহারে অত্যন্ত মানবেতর অবস্থায় দিন যাপন করেছেন। সরকারী ত্রাণ তৎপরতা লোক দেখানো এবং অপ্রতুল। তারা কিভাবে খেয়ে পড়ে বাঁচবে। কিভাবে ঋণ পরিশোধ করবে, তা ভেবে অত্যন্ত মানবেতর দিন কাটছে। স্পীডবোট যোগে বিভিন্ন গ্রামের পাশ দিয়ে হাওড় এলাকায় যাওয়ার সময় সেখান থেকে হাজার হাজার নারী-পুরুষ-শিশুর আহাজারিতে পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। আমরা আমাদের সাধ্যমত ত্রাণ সামগ্রী দিয়েছি।

* সাধারণত ব্যাংক ও বিভিন্ন এনজিও সহ মহাজনী ঋণ নিয়ে হাওড় অঞ্চলের কৃষকরা তাদের ফসল উৎপাদন করে। এবার ফসল সম্পূর্ণ বিনষ্ট হওয়ায় ঋণের চাপে এবং পরিবার পরিজনের অনিশ্চিত ভবিষ্যতে দুঃচিন্তায় যেন তাদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে। নেত্রকোণায় এপর্যন্ত একজন আত্মহত্যা এবং হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে একজনের মৃত্যুর খবরও পাওয়া গেছে।

* সরকারী ত্রাণ তৎপরতা একেবারেই অপ্রতুল এবং লোক দেখানো। খোলা বাজারে চাল ও আটা বিক্রির কথা বলা হলেও তা দৃশ্যমান নয় এবং এনিয়ে চরম দুর্নীতি হচ্ছে বলে শোনা গেছে। বর্তমান সরকার জনগণ দ্বারা নির্বাচিত নয় বলেই জনগণের প্রতি এদের কোন দায়বদ্ধতা নেই। আর সে কারণেই তারা হাওড় অঞ্চলের জনগণের দুর্দশায় নির্বিকার।

* ক্ষতিগ্রস্থ এলাকাকে অবিলম্বে দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবি জানাচ্ছি।

* প্রশাসনের উদ্যোগে দলমত নির্বিশেষে সকলকে নিয়ে কমিটি গঠনের মাধ্যমে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্থদের নির্ভুল এবং দলীয় প্রভাবমুক্ত তালিকা করে আগামী ফসল না উঠা পর্যন্ত ত্রাণ তৎপরতা চালানোর দাবি করছি।

* পুরাতন কৃষি ঋণ মত্তকুফ করার দাবি জানাচ্ছি।

* আগামী ফসলের জন্য সুদবিহীন নতুন কৃষি ঋণ দেয়ার দাবি জানাচ্ছি।

* আগামী ফসল উৎপাদনের জন্য কৃষকদের মাঝে বিনামুল্যে সার,বীজ, কিটনাশক, তেল সহ কৃষি উপকরণ দেয়ার দাবি জানাচ্ছি।

* এলাকায় ক্ষতিগ্রস্থ বাঁধগুলো আগামী ফাল্গুন মাসের আগেই পুনঃনির্মাণ/সংস্কার করতে হবে। সেখানে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নিতে হবে। এখানে উল্লেখ্য যে, ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকারের আমলেই প্রথম সরকারী ভাবে হাওড় অঞ্চলে ফসল রক্ষার জন্য বাঁধ নির্মাণ করা হয়। এর পর থেকেই প্রতি বছর ফাল্গুন মাসের আগেই বাঁধগুলো সরকারী খরচে সংস্কার করা হতো। কিন্তু এবছর বাঁধগুলো দুর্নীতি ও লুটপাটের কারণে যথাযথভাবে সংস্কার না হওয়ায় উজানের পানির ঢলে দুর্বল বাঁধগুলো ভেঙে গিয়ে ফসল নষ্ট করে।

* একইভাবে আগামী বোরো ফসল উঠার আগেই এলাকার নদীসমূহের যথাযথ ড্রেজিং করার দাবি জানাচ্ছি।

* ভারত থেকে আগত বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ৫৪টি অভিন্ন নদীসমূহে পানি প্রবাহের ন্যায্য চুক্তি করতে হবে। উজানে বাঁধ দিয়ে ভারত এসব নদীর পানি নিয়ন্ত্রণ করছে। যার ফলে বর্ষা মৌসুমে পানি ছেড়ে দেয়ায় বাংলাদেশের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে পানি আটকিয়ে দিচ্ছে।

নিঃশর্ত মুক্তির দাবী করছি:

* বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান জনাব ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সাইদুর রহমান বাচ্চু, নাটোর জেলা বিএনপি নেতা বাবলু চেয়ারম্যান, আজিজুর রহমান মেম্বার এবং নওশাদ আলী মাষ্টার সহ আটককৃত বিএনপি নেতাকর্মীদের মুক্তির দাবী।

* ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা উপজেলায় জাতীয়তাবাদী যুবদল ও ছাত্রদলের কর্মী সভায় পুলিশ বিনা উস্কানীতে হামলা চালায়। পুলিশের লাঠিচার্জে যুবদলের সদস্য সচিব শরিফুল ইসলাম স্বপন, যুগ্ম আহবায়ক মনির হোসেন বাক্কু, রবিঊল হোসেন ও ছাত্রদল নেতা মাসুদুর রহমান দিপু, গোলাম মোস্তফা সহ ৩০ জনের অধিক নেতাকর্মী গুরুত্বর আহত হয়। এছাড়া নেতাকর্মীদের বহনকৃত মাইক্রোবাস, বাস, পিকআপ পুলিশ আটক করে থানায় নিয়ে যায়। এ হামলার নিন্দা জানাচ্ছি।

* সারাদেশে নতুন করে সরকার নেতাকর্মী সমর্থকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিচ্ছে, গ্রেফতার করছে।