(বিএনপি কমিউনিকেশন) —  দেশের জনগন এবার আনন্দ নিয়ে ঈদ উদযাপন করতে পারেনি বলে অভিযোগ করেছেন বেগম খালেদা জিয়া। দুপুরে ঈদের সর্বস্তরের নাগরিকদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় শেষে বিএনপি চেয়ারপারসন এই অভিযোগ করেন।

তিনি বলেন, ‘‘ আপনারা জানেন মুসলমানদেন জন্য ঈদ অত্যন্ত আনন্দের। ঈদে আমাদের কারো মধ্যে আনন্দ নেই, সারা বাংলাদেশের মানুষের মনে কোনো আনন্দ নেই। কোনো উৎসবমুখর পরিবেশ এবার ছিলো না। যেটা ঈদের উৎসবমুখর পরিবেশ থাকে।”

‘‘কারণ সারাদেশে যত দুর্ঘটনা ঘটেছে এই বছরে। এর ফলে মানুষের মনের মধ্যে কোনো আনন্দ নেই। সকলেই শোক-দুঃখ-ব্যথা-বেদনা নিয়ে ভারাক্রান্ত মনে এই ঈদ উদযাপন করছে।”

ঈদের আনন্দ না থাকার কারণ হিসেবে দ্রব্যমূল্যের উধর্বগতি, আকাশচুম্বি চালের মূল্য, সড়ক দুর্ঘটনা, ঘুরমুখী মানুষের যাত্রাপথে ভোগান্তির বিষয়টি তুলে ধরেন খালেদা জিয়া।

‘‘ রমজান মাসে চালের দাম সর্বকালে সবচেয়ে বেশি রেকর্ড পরিমান। এই বছর এতো বেশি চালের দাম, নিম্ন মানের চালের দাম যে সাধারণ গরীব মানুষ দুই বেলা পেট ভরে খেতে পারেনি। প্রতিটি জিনিসের দাম অতিরিক্ত বেশি। তারপরে আছে বিদ্যুৎ-গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে।এই অবস্থার ঈদ কতটুকু কাকে আনন্দ দিতে পেরেছে? পারেনি।”

খালেদা জিয়া অভিযোগ করে বলেন, ‘‘ আমরা পত্রিকায় সাংবাদিক ভাইদের মাধ্যমে দেখেছি, জেনেছি যে এবার ঈদে একটা শ্রেনী আছে যারা অনেক টাকার মালিক, বহু টাকার মালিক তারা ঈদের জন্য কেউ ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর, কেউ কলকাতা-দিল্লী বিভিন্ন জায়গা থেকে ঈদের শপিং করেছেন। আর সাধারণ মানুষ হয়ত ঈদের কাপড়-টোপড় কিনতে পারেনি।”

‘‘ দেশের মধ্যে বৈষম্য বাড়ছে। একশ্রেনীর মানুষ অতিরিক্ত বড়লোক হচ্ছে নানারকম চুরি-চামারি করে এবং লুটপাট করে। আরেক শ্রেনীর মানুষ গরীব হচ্ছে। গরীবের সংখ্যা ইতিমধ্যে বেড়ে গেছে। দারিদ্রতা বেড়েছে। কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই। কর্মসংস্থান নিম্নগতি।”

সামগ্রিকভাবে মানুষের কাছে অর্থ নেই – দাবি করে তিনি বলেন, ‘‘ টাকা শুধু একটা শ্রেনীর কাছে আছে যারা সরকারের সঙ্গে, লুটপাটের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা আছে।”

সড়ক-মহাসড়কের বেহাল অবস্থার কারণে দুঘর্টনা বেড়েছে মন্তব্য করে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, ‘‘ রাস্তা-ঘাটের দুরাবস্থার কারণে এবার অনেক দূর্ঘটনা ঘটেছে, মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সেদিকে সরকারের কোনো দৃষ্টি নেই। অথচ নানাভাবে বলা হয়, ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে, ব্যাপক উন্নতি হয়েছে, দেশের এই হয়েছে, সেই হয়েছে।”

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের দুরাবস্থা ও দলীয়করণের সমালোচনা করেন খালেদা জিয়া।

প্রস্তাবিত বাজেটের নানা দিক তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘‘ এবারের বাজেট হলো সবচেয়ে খারাপ বাজেট। ওদের নেতা-কর্মীরাই ওদের অর্থমন্ত্রীকে কিভাবে গালিগালি করেছে, কী করেছে আপনারা দেখেছেন। কত বয়স্ক মানুষ। এই বাজেটের জন্য কী শুধু অর্থ মন্ত্রী দায়ী? তাকে যেভাবে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, যেভাবে আদেশ দেয়া হয়েছে সেভাবে হয়েছে। আদেশ-নির্দেশ সবকিছুই তো একজায়গা থেকে হয়, তিনি(অর্থমন্ত্রী) সেভাবে কাজ করেছেন। কাজেই দায়টা অর্থমন্ত্রীর ওপর দেয়া হয়েছে।”

‘‘ আওয়ামী লীগ দেশটাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ধবংস করেছে, দুর্নীতিতে শেষ করে দিয়েছে। মানুষের অবস্থা দিন দিন খারাপ হয়ে গেছে।মানুষ সেজন্য এই আওয়ামী লীগের হাত থেকে মুক্তি চায়, মানুষ পরিবর্তন চায়।”

প্রতিটি ক্ষেত্রে ১৫% ভ্যাট আরোপ ও ব্যাংকের আমানতের ওপর অতিরিক্ত করারোপেরও সমালোচনা করেন খালেদা জিয়া।

পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ধস, হাওর অঞ্চলে দুরাবস্থার তুলে ধরেন তিনি।

নির্বাচন প্রসঙ্গে

খালেদা জিয়া বলেন, ‘‘ হাসিনাকে ক্ষমতায় রেখে নির্বাচন করলে কোনো দিনই সেই নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না, নিরপেক্ষ হবে না। ভোটাররা ভোট দিতে যেতে পারবে না ভোটকেন্দ্রে। আওয়ামী লীগের গুন্ডা-লাঠিয়াল বাহিনীরা অত্যাচারের নমুনা আমরা অতীতে দেখেছি। পাহাড়ধসে মানুষের  দেখতে আমরা আমাদের মহাসচিবকে পাঠিয়েছিলাম, সেখানে উনার উপরে আক্রমন করেছে, গাড়ি ভাংচুর করেছে আওয়ামী লীগের গুন্ডাবাহিনী।”

‘‘ তারপরও কীভাবে আপনারা আশা করতে পারেন, আওয়ামী লীগ ও হাসিনার অধীনে ভালো নির্বাচন হতে পারে। সেটা সম্ভব নয়। সেজন্য একটা সহায়ক সরকার হতে হবে যে সরকার নিরপেক্ষ হবে, তার অধীনে নির্বাচন হলেও শুধু নির্বাচন কমিশনও নিরপেক্ষ থাকতে পারবে এবং সেখানে সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে। আমরা মনে করি, সেনা বাহিনী মোতায়েন থাকলে নির্বাচনে জনগন ভোট কেন্দ্রে আসতে পারবেন, নির্ভয়ে ভোট দিতে পারবে এবং একটি সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে- এটাই মানুষের প্রত্যাশা।”

ক্ষমতাসীনদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘‘ আমি বলব যে, আওয়ামী লীগ। ১০ বছর ছিলেন ক্ষমতায়, লুটপাট করেছেন, অনেক মানুষ খুন করেছেন, অনেক হত্যা করেছেন, অনেক অপরাধ করেছেন। এই অপরাধের শাস্তি হয়ত আল্লাহর কাছ থেকে আপনারা একদিন পাবেন।”

‘‘ এখন বলি, আল্লাহ‘র নামে দেশটা ও মানুষদের বাঁচানোর জন্য ক্ষমতা থেকে বিদায় নেন। নিরপেক্ষ নির্বাচন দিন। নিরপেক্ষ নির্বাচনে ক্ষমতায় আসলে বলার কিছু নেই। আমরা বলি, নিরপেক্ষ নির্বাচন হোক, জনগনের ভোটের যারা নির্বাচিত হবে, তারাই দায়িত্ব নিয়ে দেশ থেকে অশান্তি, অরাজগতা, ‍লুটপাট-দুর্নীতি খুন-গুম-হ্ত্যা, দ্রব্যমূল্যের উধর্বগতি ও চালের দাম সর্বনিম্ন পর্যায় নিয়ে আসা সম্ভব হবে।”

শেরে বাংলা নগরে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এই ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠান হয় ‍যাতে বিভিন্ন দেশের কুটনীতিক ও সর্বস্তরের নাগরিকরা আসেন।

এতে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাসির্য়া স্টিফেন্স ব্লুম বানির্কাট, যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার অ্যালিসন ব্লেক, ভ্যাটিকেন সিটির রাষ্ট্রদূত আর্চবিশপ জর্জ কোচেরী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত পিয়েরে মায়াদনসহ বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা বেগম জিয়ার সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।

এ সময়ে খালেদার পাশে ছিলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মওদুদ আহমদ, জমিরউদ্দিন সরকার, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সাবিহ উদ্দিন আহমেদ, বিশেষ সম্পাদক আসাদুজ্জামান রিপন উপস্থিত ছিলেন।

কুটনীতিকদের সেমাই-জর্দা-মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়।

বিশিষ্ট নাগরিকদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময়ের মাধ্যমে বিএনপি চেয়ারপারসনের এই অনুষ্ঠান শুরু হয়।

এতে শিক্ষাবিদ অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমেদ, অধ্যাপক মাহবুবউল্লাহ, অধ্যাপক আফম ইউসুফ হায়দার, অধ্যাপক সদরুল আমিন, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সম্পাদক মাহবুবউদ্দিন খোকন, ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শওকত মাহমুদ, সাবেক সভাপতি রুহুল আমিন গাজী, সাবেক মহাসচিব এম এ আজিজ, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি আবদুল হাই শিকদার, জাতীয় প্রেস ক্লাবের যুগ্ম সম্পাদক ইলিয়াস খানসহ বিভিন্ন পেশার নেতৃবৃন্দ ছিলেন।

২০ দলীয় জোটের মধ্যে কল্যাণ পার্টি সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, জাতীয় পারিরট( কাজী জাফর) মোস্তফা জামাল হায়দার, জামায়াতে ইসলামীর মজিবুর রহমান, মিয়া গোলাম পারওয়ার, জাগপার রেহানা প্রধান, তাসমিয়া প্রধান, ইসলামী ঐ্ক্যজোটের মাওলানা আবদুল করীম, এনডিপির খোন্দকার গোলাম মোর্ত্তজা, এনপিপি‘র ফরিদুজ্জাামান ফরহাদ, লেবার পার্টির মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, ন্যাপ-ভাসানীর আজহারুল ইসলাম, মুসলিম লীগের এএইচএম কামরুজ্জামান খান, সাম্যবাদী দলের সাঈদ আহমেদ, এলডিপির সাহাদাত হোসেন সেলিমও শুভেচ্ছা বিনিময় করতে আসেন।

বিএনপির নেতৃবৃন্দের মধ্যে ছিলেন শাহজাহান ওমর, আহমেদ আজম খান, নিতাই রায় চৌধুরী, আমানউল্লাহ আমান, আবদুল মান্নান, আবদুল কাইয়ুম, তৈমুর আলম খন্দকার, ইসমাইল জবিউল্লাহ, অধ্যাপক সুকোমল বড়ুয়া, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, খায়রুল কবির খোকন, হাবিবউন নবী খান সোহেল, হারুনুর রশীদ, সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, শামা ওবায়েদ, সানাউল্লাহ মিয়া, মাসুদ আহমেদ তালুকদার, আমিনুল হক, ফাওয়াজ হোসেন শুভ, নাজিমউদ্দিন আলম, মীর সরফত আলী সপু, অঙ্গসংগঠনের মধ্যে ইশতিয়াক আজিজ উলফাত, সাইফুল আলম নিরব, সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু, আবদুল কাদের ভুঁইয়া জুয়েল, আনোয়ার হোসা্ইন, নুরুল ইসলাম খান নাসিম, সুলতানা আহমেদ, হেলেন জেরিন খান, রাজীব আহসান, আকরামুল হাসান, মহানগর দক্ষিনের কাজী আবুল বাশার, উত্তরের আহসানউল্লাহ হাসান, বিএনপি চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারি, শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, ব্যক্তিগত সচিব আবদুস সাত্তার,  প্রেস উইংয়ের শায়রুল কবির খান, শামসুদ্দিন দিদারসহ দলের বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীরা তাদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে খালেদা জিয়াকে ঈদ শুভেচ্ছা জানান।

জিয়া ও কোকোর কবর জিয়ারত

ঈদের শুভেচ্ছা বিনিয়ম শেষে খালেদা জিয়া প্রথমে শেরে বাংলা নগরে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও পরে বনানীতে ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর কবর জিয়ারত করেন।

এ সময়ে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মওদুদ আহমদ, জমিরউদ্দিন সরকার, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আমানউল্লাহ আমান, রুহুল কবির রিজভীসহ কেন্দ্রীয় নেতারা ছিলেন।

পরে বিএনপি চেয়ারপারসন গুলশানে নিজের বাসা ‘ফিরোজায়’ যান।