(বিএনপি কমিউনিকেশন) — বিএনপি’র সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, সরকার ক্ষমতার মোহে অন্ধ, তাই অন্ধের মতন শেষ পর্যন্ত পথের সন্ধান পায় না। এরা দেশকে গণতন্ত্রহীন করে নৈরাজ্যের গভীর গাঢ় অন্ধকারের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে।

রোববার, জুলাই ১৬, রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

সম্পূর্ণ প্রেস ব্রিফিংটি নিচে তুলে ধরা হলো-

আপনারা দেখেছেন- রাজধানীতে মশার ব্যাপকতা বেড়ে যাওয়ায় চিকুনগুনিয়া নামক ব্যাপকবিস্তারী রোগটি এখন মহামারী আকার ধারণ করেছে। অথচ মশক নিধনে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনে শত শত কোটি টাকা ব্যয়ের কথা বলা হয়েছে। এত টাকা ব্যয় হলেও ন্যুনতম মশক নিধন হয়নি, তাহলে টাকাগুলো গেল কোথায় ? মশা নিধনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করে দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে লাগামহীন কথাবার্তা বলা হচ্ছে। মেয়রদের বক্তব্যে নগরবাসীর মধ্যে দেখা দিয়েছে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া। কিন্তু মশক নিধনের ব্যর্থতার কারণে ঢাকা শহরে শুরু হওয়া চিকুনগুনিয়া যেভাবে সারাদেশে মহামারী আকার ধারণ করেছে তাতে জনগণের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। দেশে জনস্বাস্থ্য এখন চরম হুমকির মুখে। সরকার এবং দুই মেয়র এর দায় এড়াতে পারে না।

চিকুনগুনিয়ার মতো মহামারীর আগ্রাসন প্রতিরোধে সরকারের প্রস্তুতি দুরে থাক বরং সরকার ও সরকারের প্রতিনিধিরা জনগণের দু:খ-কষ্ট নিয়ে উপহাস করছে। শুধু মশা নয়, জনগণ সিটি কর্পোরেশনের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সেবাগুলি পাচ্ছে না, বরং তারা এখন চরম জনদুর্ভোগের মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছে। সাংবাদিক বন্ধুরা আপনারা দেখেছেন-ঢাকা শহরে বৃষ্টির মৌসুমেই শুরু হয় খো্ড়াঁখুড়ি, বৃষ্টির পানিতে রাস্তাঘাটগুলো খাল-বিলে পরিণত হয়। চরম বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে মানুষের যাতায়াত। ফলে নগরজীবন ভয়াবহ দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। এর দায় কোনক্রমের সরকার এড়াতে পারেনা। বরং সরকারের গণবিরোধী অগণতান্ত্রিক দু:শাসনের কারণেই দেশের সামগ্রিক অবকাঠামোই এখন ভেঙ্গে পড়েছে।

সাংবাদিক বন্ধুরা
সারাদেশের গ্রাম-গঞ্জে, মফ:স্বল শহরে চলছে ভয়াবহ লোডশেডিং। এমনকি রাজধানীও এর ব্যতিক্রম নয়। তারপরও বিদ্যুৎ এর উন্নতি নিয়ে সরকার সন্তুষ্টির কথা অহরহ জনগণকে শুনিয়ে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের সত্তা ও স্বরুপ মিথ্যা দর্শণের ওপর প্রতিষ্ঠিত। অবাধ দুর্নীতি আর লুটপাট জারি রাখতে এরা ক্ষমতার পর্বতচুড়ায় উঠে এখন আর নামতে পারছে না। এমন কোন সেক্টর নেই যেখানে ক্ষমতাসীনরা দুর্নীতির আখড়া বানায়নি। তাই মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে মানুষের মনভোলানোর ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। রেন্টাল ও কুইক রেন্টালে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পের নামে দেশে হরিলুট চলছে। গণমাধ্যমের খবর, গত ৯ বছরে বিদ্যুৎ নামে উৎপাদন ছাড়াই প্রণোদনা ( ইনসেন্টিভ) হিসেবে প্রকল্পের মালিকেরা সরকারের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে ৩৯,২২৬ কোটি টাকা। বেসরকারি বিদ্যুৎ উদ্যোক্তারা তাদের সাথে সরকারের চুক্তি হিসেবে বিশেষ শর্তে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট আকারে আদায় করে নিচ্ছে এসব অর্থ। সরকারের ভ্রান্তনীতির কারণে স্বল্পব্যয়ে মধ্যমেয়াদী বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো ব্যর্থ হয়েছে। তাই এখন তারা রেন্টাল-কুইক রেন্টালের উপর প্রচন্ডভাবে নির্ভরশীল। সরকারের এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে সুবিধাভোগী একশ্রেণীর উদ্যোক্তরা বিপুল পরিমান অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। সর্বত্রই আলোচনা হচ্ছে রেন্টাল ও কুইক রেন্টালের নামে যারা হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করছে তারা সরকারেরই ঘনিষ্ট লোক ও শীর্ষ নেতাদের আত্মীয়স্বজন। লুটের টাকার ভাগ জায়গা মতো পৌঁছায়। আজও একটি গণমাধ্যমে এসেছে-মাত্র একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রেই সরকারের গচ্চা প্রায় দুই হাজার তিনশ’ কোটি টাকা। চুক্তি অনুযায়ী ফার্নেস অয়েলের পরিবর্তে ডিজেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করায় সরকারের এ অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হচ্ছে। ৩০৫ মেগাওয়াটের সামিট মেঘনাঘাট পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের (এসএমপিসিএল) কাছ থেকে বিদ্যুৎ কিনতে গিয়ে সরকারকে এ অর্থ গচ্চা দিতে হচ্ছে। আগামী ২২ বছর এ হারে বিদ্যুৎ কিনতে হলে ২৫ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হবে। সামিট মেঘনাঘাট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ফার্নেস অয়েল এবং গ্যাসচালিত মেশিন বসানোর কথা। কিন্তু বসানো হয়েছে ডিজেল ও গ্যাসচালিত মেশিন। এতে দ্বিগুণের বেশি ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। এ কারণে ইউনিটপ্রতি বিদ্যুৎ কেনার খরচ ফার্নেস অয়েলে উৎপাদনের চেয়ে তিনগুণ বেশী।

বিশেষজ্ঞদের মতে-কম মূল্যের জ্বালানি ফার্নেস অয়েলে বিদ্যুৎ কেন্দ্র করলে ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠজনদের বড় বড় কোম্পানিগুলোকে বেশি টাকার সুবিধা দেয়া যায় না। এ জন্য উচ্চমূল্যের জ্বালানি ডিজেল দিয়ে বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনার অনুমতি দিচ্ছে সরকার। আর এই ঘাটতি মেটাতে দফায় দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হচ্ছে। জনগণের পকেট কাটছে। বড় বড় কোম্পানিগুলোকে অনৈতিক সুবিধা দিয়ে জনগণের পকেট কাটছে সরকার। জনগণের টাকা আত্মসাৎ করার জন্য শাসকগোষ্ঠী এতোই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে যে, তারা বর্তমান রাজনৈতিক সংকট সমাধানের প্রশস্ত রাজপথের দিকে না গিয়ে চক্রান্তের বদ্ধ চোরাগলিতেই হাঁটছে। এরা ক্ষমতার মোহে অন্ধ, তাই অন্ধের মতন শেষ পর্যন্ত পথের সন্ধান পায় না। এরা দেশকে গণতন্ত্রহীন করে নৈরাজ্যের গভীর গাঢ় অন্ধকারের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে।

সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা,
উজান থেকে নেমে আসা পানির ঢল ও বৃষ্টিতে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে যে ভয়াবহ বন্যা হচ্ছে তাতে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে সীমাহীন দূর্ভোগে পড়েছে বানভাসী মানুষ। বিএনপি’র পক্ষ থেকে আমরা বারবার বন্যাদুর্গতদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আহবান জানিয়ে এসেছি। বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বিএনপি নেতাকর্মী ও দেশের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে বানভাসী মানুষের পাশে দাঁড়াতে আহবান জানিয়েছেন। ইতোমধ্যে স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা বন্যাদুর্গতদেরকে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করতে শুরু করেছে এবং বিএনপি’র পক্ষ থেকে এই সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। কিন্তু সরকারের মন্ত্রীরা ত্রাণ সহায়তা নিয়ে পাড়া-জাগানো চিৎকার করলেও বন্যাদুর্গতদের কাছে এখনও সরকারী ত্রাণ পৌঁছায়নি। গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে-বন্যা আক্রান্ত এলাকায় যতটুকু সরকারী ত্রাণ গেছে তা স্থানীয় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ও তাদের আত্মীয়স্বজনরাই লুটে নিচ্ছে, গরীব-অসহায় ও ক্ষুধার্ত মানুষরা কোন ত্রাণ পাচ্ছে না। অপরদিকে বন্যায় বানভাসী মানুষের বাড়ীঘর পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কোথাও খোলা আকাশের নীচে বসবাস করছে, আবার কেউ কেউ কলাগাছের ভেলাতেই দিনাতিপাত করছে।

বন্ধুরা, আপনারা গণমাধ্যমে দেখেছেন-ত্রাণের সামান্য কিছু সন্ধান পেলে কলাগাছের ভেলায় চড়ে বানভাসী মানুষ ছুটে আসছে, কিন্তু সত্যিকার অর্থে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও বাসস্থানের অভাবে বন্যাদুর্গত মানুষরা এখন মানবেতর জীবনযাপন করছে। বন্যাদুর্গত লাখ লাখ আর্ত নর-নারী শুস্ককন্ঠে কেবল দুটো ভাত চাইছে, সরকার কত ত্রাণ দিয়েছে সেই পরিসংখ্যান শুনতে চাচ্ছে না। আমি আবারো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি’র পক্ষ থেকে দলের সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের স্বচ্ছল মানুষকে ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে বানভাসী চরমকষ্টে নিপতিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহবান জানাচ্ছি। ধন্যবাদ সবাইকে। আল্লাহ হাফেজ।