(বিএনপি কমিউনিকেশনস)  —  বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আইন কমিশনের আসনে বসে সুপ্রিম কোর্টের রায় সম্পর্কে প্রধান বিচারপতি সম্পর্কে বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক যেসব উক্তি করেছেন, তা শুধু অশালীনই নয়, রীতিমতো আদালত অবমাননার শামিল।

বৃহস্পতিবার, আগস্ট ১০, বিকেলে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ কথা বলেন। তিনি ভোটারবিহীন সংসদকে বিচারকদের অভিশংসন ও অপসারণের দায়িত্ব দেওয়ার পক্ষে কথা বলার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘বিচারপতি খায়রুল হকের বক্তব্যকে আমরা ধিক্কার জানাই। তিনি কৃতকর্মের জন্য কোনো অনুশোচনা তো করেননি, বরং একটি অন্যায়ের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন।’

বিএনপির মহাসচিব বলেন, ‘সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ বাতিল করেছেন। ৭৯৯ পৃষ্ঠার ঐতিহাসিক এ রায়টির মাধ্যমে বর্তমান রাজনৈতিক, সামাজিক প্রেক্ষাপট এবং রাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে একটি ম্যাগনাকার্টা বলেই আমাদের কাছে মনে হয়েছে। সত্য উদ্ভাসিত হয়েছে নির্ভিকভাবে। হতাশাগ্রস্ত জাতি এই রায়ের মাধ্যমে আশার আলো দেখতে পেয়েছে। আমরা সে জন্যই এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছি এবং আপিল বিভাগকে অভিনন্দন জানিয়েছি।’

মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘অত্যন্ত পরিতাপের সঙ্গে লক্ষ্য করলাম, সরকার বা সরকারি দল আওয়ামী লীগ কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেওয়ার আগেই সাবেক প্রধান বিচারপতি ও বর্তমানে আইন কমিশন চেয়ারম্যান বিচারপতি খায়রুল হক রায়ের বিরুদ্ধে বিষোদ্‌গার করলেন। মনে হলো, এই রায়ের ফলে তাঁর গাত্রদাহ শুরু হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, বিচারপতি খায়রুল হক তাঁর সময় যেসব রায় দিয়েছেন, তা বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে কতখানি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে তা দেশের মানুষ এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। সংবিধানের পঞ্চম, সপ্তম ও ১৩তম সংশোধনী বাতিলের ফলে আজ দেশে যে সাংবিধানিক, রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে তা দেশের গণতন্ত্রকে পুরোপুরি ভঙ্গুর করে ফেলেছে।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘বিচারপতি খায়রুল হকের বক্তব্যের সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতা ও মন্ত্রীদের বক্তব্যের কোনো অমিল নেই। বিচারপতি হকের রায়ের পরেই বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অস্থিতিশীলতা এবং হতাশা বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকার লাগামহীন হয়ে উঠেছে। এ রায়ের ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের ফলস্বরূপ আওয়ামী লীগ বহুদলীয় গণতন্ত্রের দর্শনের মূল উৎপাটন করে প্রায় একদলীয় একনায়কতান্ত্রিক সরকার চাপিয়ে দিয়েছে। একদলীয় দুঃশাসনে রাষ্ট্র পরিচালিত হচ্ছে। দুর্নীতি আজ সকল নজির ছড়িয়ে গেছে। জনগণ ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কোনো কার্যকরী সংসদ নেই। বর্তমান সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসেনি। ১৫৩ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা, বাকি ১৪৭ আসনে প্রকৃতপক্ষে কোনো ভোটার ভোট দিতে যাননি। সেই পার্লামেন্টে বিচারকদের অভিশংসন, অপসারণের দায়িত্ব পেলে শেষ ভরসার জায়গাটুকু হারিয়ে যাবে। বিচারপতি খায়রুল হক একটি অন্যায়ের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন।’

রায় নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রতিক্রিয়ার কথা উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, তারা (আওয়ামী লীগ) হতাশ হয়েছেন, সংক্ষুব্ধ হয়েছেন। তা তো হবেনই। তাদের সৃষ্ট দানব যে, তাদেরই গ্রাস করতে চলছে তা এখনো তারা বুঝতে পারছেন না। তিনি বলেন, ‘আমরা সংগ্রাম করছি সুশাসন, ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্রের জন্য। লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত এই সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।’

সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব প্রদত্ত বক্তব্য নিচে তুলে দেয়া হলো –

সুপ্রিয় সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা,

আসসালামু আলাইকুম। সবাইকে জানাচ্ছি আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা।

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগ বাতিল করেছেন। ৭৯৯ পৃষ্ঠার ঐতিহাসিক, দার্শনিক দিক-নির্দেশনামূলক (Document) বা দলিল এই রায়টির মাধ্যমে বর্তমান রাজনৈতিক, সামাজিক প্রেক্ষাপট এবং রাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে একটি ম্যাগনাকার্টা বলেই আমাদের কাছে মনে হয়েছে। সত্য উদ্ভাসিত হয়েছে নির্ভিকভাবে। হতাশাগ্রস্ত জাতি এই এই রায়ের মাধ্যমে আশার আলো দেখতে পেয়েছে। আমরা সেজন্যই এই রায়কে স্বাগত: জানিয়েছি এবং আপিল বিভাগকে অভিনন্দন জানিয়েছি।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ, অত্যন্ত পরিতাপের সঙ্গে লক্ষ্য করলাম যে, সরকার বা সরকারী দল আওয়ামী লীগ কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেওয়ার পূর্বেই সাবেক প্রধান বিচারপতি বর্তমান আইন কমিশন চেয়ারম্যান বিচারপতি খায়রুল হক রায়ের বিরুদ্ধে বিষোদগার করলেন। মনে হলো-এই রায়ের ফলে তাঁর গাত্রদাহ শুরু হয়েছে। আইন কমিশনের আসনে বসে সুপ্রীম কোর্টের রায় সম্পর্কে মাননীয় প্রধান বিচারপতি সম্পর্কে তিনি যেসব উক্তি করেছেন তা শুধু অশালীনই নয়, তা রীতিমত আদালত অবমাননার সামিল।

বিচারপতি খায়রুল হক তাঁর সময় যেসব রায় দিয়েছেন তা বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে কতখানি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে তা দেশের মানুষ এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে।

৫ম, ৭ম ও ১৩তম সংশোধনী বাতিলের ফলে আজ দেশে যে সাংবিধানিক, রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে তা দেশের গণতন্ত্রকে পুরোপুরি ভংগুর করে ফেলেছে। বিচারপতি খায়রুল হকের বক্তব্য আওয়ামী লীগের নেতা ও মন্ত্রীদের বক্তব্যের মধ্যে কোনও অমিল নেই। একই সুরে বাধা। বিচারপতি খাইরুলের বক্তব্যই আওয়ামীলীগের বক্তব্য। বিচারপতি হকের রায়ের পরেই বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অস্থীতিশিলতা এবং হতাশা বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকার হয়ে উঠেছে লাগামহীন। এ রায়ের ফলে তত্তাবধায়ক সরকার বাতিলের ফলসরূপ আওয়ামী লীগ বহুদলীয় গণতন্ত্রের দর্শনের মূল উৎপাটন করে প্রায় একদলীয় একনায়কতান্ত্রিক সরকার চাপিয়ে দিয়েছে। কোন কার্যকরী পার্লামেন্ট নেই। সরকারের কোন জবাবদিহীতা নেই, তাই সকল গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে জলাঞ্জলী দিয়ে একদলীয় দু:শাষণে রাষ্ট্র পরিচালিত হচ্ছে। দূর্নীতি আজ সকল নজির ছড়িয়ে গেছে। জণগন ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বর্তমান সরকারের জণগনের কোন ম্যান্ডেড নেই- পার্লামেন্টও নেই। তারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসেনি। ১৫৩ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা, বাকি ১৪৭ আসনে প্রকৃত পক্ষে কোন ভোটারই ভোট দিতে যাননি। সেই পার্লামেন্টে বিচারকদের অভিসংশন, অপসারনের দায়িত্ব পেলে শেষ ভরসার জায়গাটুকু হারিয়ে যাবে। বিচারপতি খাইরুল হকের বক্তব্যকে আমরা ধিক্কার জানাই যে, তিনি কৃতকর্মের জন্য কোন শোচনা তো করেননি বরং একটি অন্যায়ের পক্ষে সাপাই গেয়েছেন।

গতকাল এবং আজ আওয়ামী লীগের পক্ষথেকে এই রায়ের উপর প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। তারা হতাশ হয়েছেন, সংক্ষুদ্ধ হয়েছেন। তাতো হবেনই। তাদের সৃষ্ট দানব যে তাদেরকেই গ্রাস করতে চলছে তা এখনও তারা বুঝতে পারছেন না। সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগকে আর একবার ধন্যবাদ জানাই এই জন্য যে তাঁরা তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। সীমাহীন  দুর্নীতি, দ্রুত দুঃশাসন, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অহংকার আজ স্বাধীনতা যুদ্ধের সকল স্বপ্ন ও অর্জনগুলিকে ভেঙ্গে চুরে চুরমার করে দিচ্ছে। এই দুঃসময়ে সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগের এই রায় সুশাসনের জন্য, ন্যায়বিচারের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য, মানবাধিকারের জন্য, নিঃসন্দেহে আশার আলো।

আমরা সংগ্রাম করছি, সুশাসন, ন্যায় বিচার ও গণতন্ত্রের জন্য। আমাদের লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্তু এই সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে। বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের আশা আকাংখার প্রতীক গণতন্ত্রের প্রশ্নে আপোষহীন নেত্রী সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার চোখে গতকাল লন্ডনের হাসপাতালে সাফল্যের সঙ্গে অস্ত্রপচার হয়েছে। আশা করি তিনি দ্রুত আরোগ্যলাভ  করে আমাদের সঙ্গে মিলিত হবেন। আমরা তাঁর দ্রুত আরোগ্য লাভের জন্য আগামী শুক্রবার ও শনিবার সারাদেশে মসজিদ, মন্দির, গীর্জায় সকল ধর্মের মানুষের কাছে দোয়া চাই।

ধন্যবাদ সবাইকে। আল্লাহ হাফেজ।