(বিএনপি কমিউনিকেশনস)  — শুক্রবার, আগস্ট ১১,  রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি’র সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, সর্বোচ্চ আদালতে দোষী ও দন্ডিত অপরাধী খাদ্যমন্ত্রীর বক্তব্য চরম ঔদ্বত্যপূর্ণ ও স্বাধীন বিচার বিভাগের প্রতি হুমকি।

সংবাদ সম্মেলনে প্রদত্ত বক্তব্য নিচে তুলে দেয়া হলো –

সুপ্রিয় সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা,
আসসালামু আলাইকুম। সবাইকে জানাচ্ছি আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা ও কৃতজ্ঞতা।

বন্ধুরা,
গতকাল মাননীয় প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার অপসারণ দাবি করেছেন খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম। প্রধান বিচারপতির উদ্দেশে খাদ্যমন্ত্রী বলেছেন, “তার যদি নৈতিকতা থাকে তাহলে স্বেচ্ছায় চলে যাবেন। না হলে আইনজীবীরা তার বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলবেন।” আগামী সেপ্টেম্বরে আইনজীবীরা আন্দোলন গড়ে তুলবেন বলে উল্লেখ করেন তিনি। খাদ্যমন্ত্রী বিচারপতিকে উদ্দেশ করে বলেন, “তাঁর (প্রধান বিচারপতি) যদি সামান্যতম জ্ঞান ও বুঝ থাকে, তাহলে তিনি স্বেচ্ছায় চলে যাবেন। বিএনপি’র সঙ্গে বন্ধুত্ব করে, বিএনপির সুরে কথা বলে, মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের সঙ্গে আঁতাত করে বেশিদিন এ মসনদে থাকতে পারবেন না। এখন আর চোখ বুজে থাকার সুযোগ নেই। এখন কারও রক্তচক্ষু সহ্য করব না। অবশ্যই আমরা তার অপসারণ চাই।”

বন্ধুরা,

খাদ্যমন্ত্রী কামরুল আপনি কোন নৈতিকতা নিয়ে কথা বলছেন, আপনি কি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন? কামরুল সাহেব, নিজের দিকে তাকালে লজ্জা করে না আপনার। আপনিতো সর্বোচ্চ আদালতে দোষী ও দন্ডিত অপরাধী। আপনি সংবিধান রক্ষার শপথ ভঙ্গ করে এখনও মন্ত্রী হিসেবে বহাল রয়েছেন। বিশ্বের ইতিহাসে এমন নজির কি কোথাও আছে, সর্বোচ্চ আদালতে দন্ডিত ব্যক্তি মন্ত্রী হিসেবে বহাল থাকতে পারে? দন্ডিত মন্ত্রীদের নিয়ে যে মন্ত্রীসভা অনুষ্ঠিত হয় তাদের মুখে বিচার বিভাগের সমালোচনা করাটাও জাতির জন্য লজ্জাস্কর। এটাই স্বাভাবিক যে, দন্ডিত অপরাধীরা সত্য ও ন্যায় বিচার সহ্য করবে না। তারা আইনের শাসনের কথা শুনলেই আঁতকে উঠবে। খাদ্যমন্ত্রীর বক্তব্য চরম ঔদ্বত্যপূর্ণ ও স্বাধীন বিচার বিভাগের প্রতি হুমকি।

সাংবাদিক বন্ধুরা,
সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় সম্পর্কে সাবেক প্রধান বিচারপতি ও বর্তমান আইন কমিশনের চেয়ারম্যান এবিএম খায়রুল হকের সংবাদ সম্মেলনে দেয়া বক্তব্য নিয়ে দেশজুড়ে নিন্দার ঝড় বইছে। আমাদের দলের পক্ষ থেকেও গতকাল বিএনপির মহাসচিব মহোদয় আপনাদের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। আইন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে তিনি সর্বোচ্চ আদালতের রায় নিয়ে যে তিক্ত ও প্রতিহিংসামূলক সমালোচনা করেছেন সেটা তার চাকুরীর আচরণবিধির পরিপন্থী। তিনি চীফ জাস্টিস থাকা অবস্থায় একটি রায়ে বলেছিলেন-সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকের অবসরের পরে লাভজনক কোন পদে চাকুরী করতে পারবে না। তিনি কত বড় ভন্ড হলে নিজের রায়ের কথা নিজেই ভঙ্গ করেছেন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে এ বি এম খায়রুল হক দেশকে চূড়ান্তভাবে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছেন, গণতন্ত্রকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছেন। বর্তমান রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং সংঘাতময় পরিস্থিতির জন্য বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকই দায়ী। বিচারপতি খায়রুল হক বলেছেন “ষোড়শ সংশোধনীর রায় আগে থেকেই লিখে রাখা হয়েছে, ‘বিচার বিভাগ অপরিপক্ক’-এ ধরনের কথাবার্তা তার (এবিএম খায়রুল হক) মুখ থেকে শোভা পায় না। আপনি কী ভুলে গেছেন, মুন সিনেমার রায়কে আপনি বিচার্য বিষয়ের বাইরে টেনে নিয়ে গিয়ে একদলীয় শাসন তথা দ্বিতীয় বাকশালী শাসনের পথ সুগম করেছেন। এবং আপনি প্রধান বিচারপতি থাকার সময় সরকারের সাথে একের পর এক গোপন কারসাজিতে লিপ্ত থেকে শেখ হাসিনার মনোবাসনা পূরণ করতে সংবিধানের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করেছেন। মূলত: আপনি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে নির্বাচনহীন এক ব্যক্তির দু:শাসন চালু রাখতে সহায়তা করে দেশের স্থিতিশীলতা ধ্বংস করেছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা দেশের মানুষের আশা-ভরসার জায়গা ছিল। এ ব্যবস্থা বাতিল করে দিয়ে বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক দেশের গণতন্ত্রের জন্য সর্বোচ্চ খারাপ নজির স্থাপন করে গেছেন। আবার তিনি ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায় যখন আদালতে প্রকাশ্যে পড়ে শোনান তখন তিনি বলেছিলেন আরও দুই মেয়াদের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। অথচ এর ১৬ মাস পর যখন তিনি পূর্ণাঙ্গ রায় লিখিতভাবে প্রকাশ করলেন তাতে এ কথাটাই বাদ দিয়ে জাতির সঙ্গে প্রতারণা করেছিলেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তিনি যে তা করেছিলেন তার বর্তমান বক্তব্যে সেটি আবারও জনগণের কাছে প্রমানিত হলো। ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের প্রতিক্রিয়ায় তিনি যে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন সেটিও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই করেছেন। পরে এর পুরস্কারও পেয়েছেন তিনি আইন কমিশনের চেয়ারম্যান হয়ে। তিনি প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে পুরস্কার হিসেবে ১০ লাখ টাকাও নিয়েছেন চিকিৎসার কথা বলে, যা সেসময় গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছিল। একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির সরকারের এধরণের চাকুরী গ্রহণ করা নজীরবিহীন এবং আত্মবিক্রয়ের এক উজ্জল দৃষ্টান্ত। ভবিষ্যতে হয়তো আরও বড় কোনো পুরস্কারের আশায় ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে তিনি মনগড়া কথা বলেছেন। ভবিষ্যতে তিনি হয়তো আরও বড় ধরনের পুরস্কারের আশা করছেন। সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক আইনের শাসন, গণতন্ত্র, মানুষের ভোটের অধিকার তথা জনগণের শত্রু ও বর্তমান এক ব্যক্তির ভয়াবহ দু:শাসনের ঘৃন্য সেবক। এই সাবেক প্রধান বিচারপতি যুক্তি, বিবেকবর্জিত ও চাকুরী লোভী বিচারপতি হিসেবে তার ঠাঁই হবে ইতিহাসের আস্তকুঁড়ে।

ধন্যবাদ সবাইকে। আল্লাহ হাফেজ।