(বিএনপি কমিউনিকেশনস)   —  প্রধান বিচারপতি সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া বক্তব্যকে ‘অশনি সংকেত’ অভিহিত করে তা দেশের পরিস্থিতিকে ‘আরো নৈরাজ্যকর’ করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

তিনি বলেন, গতকাল (সোমবার) একটি দলীয় সভায় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট, বিচার বিভাগ, বিচারকবৃন্দ এমনকি প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণ করে যে বক্তব্য দিয়েছেন তাতে আমরা বিচলিত ও হতবাক হয়েছি। বর্তমান  ক্ষমতাসীনরা রায়ের কারণে বিচার বিভাগকে আক্রমণের টার্গেটে পরিণত করে যে পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন – তা দেশ, জাতি ও রাজনীতির জন্য এক অশনি সংকেত বলেই আমরা মনে করি।

মংগলবার, আগস্ট ২২, সন্ধ্যায় গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব মন্তব্য করেন।

মির্জা ফখরুল বলেন, ক্ষমতাসীনদের অপছন্দের রায় দেয়ার কারণে তিনি (প্রধানমন্ত্রী) তার বক্তৃতায় প্রধান বিচারপতিকে সরে যাওয়ারও হুমকি দিয়েছেন এবং বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে জনগণকে উস্কে দেয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করেছেন। এই দায়িত্বজ্ঞানহীনতা দেশের পরিস্থিতিকে আরো নৈরাজ্যকর করে তুলতে পারে বলে আমরা আশঙ্কা করছি।

মঙ্গলবার, আগস্ট ২২, সন্ধ্যায় গুলশান বিএনপি চেয়ারপার্সনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এতে আরো উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, ভাইস চেয়ারম্যান আহমেদ আজম খান, নিতাই রায় চৌধুরী, কেন্দ্রীয় নেতা আতাউর রহমান ঢালী, শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানি প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

তিনি বলেন, বর্তমান সংসদ ও সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয় বলে তারা জনগণের সত্যিকারের প্রতিনিধিত্ব করে না। তবুও যেভাবেই হোক শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদে আছেন। এমন একটি দায়িত্বশীল পদে থেকে তিনি যেভাবে রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রকাশ্যেই পারস্পরিক সংঘর্ষের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন তা আগুন নিয়ে খেলার শামিল। আমরা স্পষ্টভাষায় বলতে চাই, ক্ষমতায় থেকে বিচার বিভাগ ও দেশের সর্বোচ্চ আদালতকে এভাবে হেয় করলে তার পরিণাম কখনো শুভ হয় না। আমরা এই আত্মঘাতী পথ থেকে সরে আসার জন্য ক্ষমতাসীনদের প্রতি আহবান জানাচ্ছি। তিনি বলেন, জনগণের গণতান্ত্রিক দল হিসেবে বিএনপি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্বাতন্ত্র্য ও মর্যাদার প্রতি দৃঢ় অবস্থান ঘোষণা করছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায়শ আমাদেরকে আদালতের রায় মেনে চলার পরামর্শ দেন। সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের (এবিএম খায়রুল হক) রাজনৈতিক রঙে রঞ্জিত কিছু রায়ে শুধু বিএনপি নয়, দেশ ও জনগণও ক্ষতিগস্ত হয়েছে। আমরা সরকারে থাকার সময়েও কিছু রায় বিএনপির রাজনীতি-আদর্শ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তবুও আমরা বিচারক ও কোর্টের বিরুদ্ধে এমন আক্রমণাত্মক ভূমিকা নেইনি।

অতীতে ক্ষমতাসীনরা ‘রায় পছন্দ না হলে বিচারকদের বিরুদ্ধে লাঠি মিছিল, সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে বস্তি বসানো, প্রধান বিচারপতির এজলাস ভাংগচুরের ঘটনাও তুলে ধরেন বিএনপি মহাসচিব। এবার তারা (আওয়ামী লীগ) প্রধান বিচারপতিসহ উচ্চ আদালতকে আক্রমণের ল্যবস্তুতে পরিণত করেছে। বিচার বিভাগের ব্যাপারে তাদের নীতিই হচ্ছে, বিচার মানি কিন্তু তালগাছ আমার।

জনগণকে সতর্ক থাকার আহবান জানিয়ে  মির্জা ফখরুল বলেন,  আমরা জনগণকে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান গ্রহণের আহবান জানাচ্ছি।

প্রধান বিচারপতিকে সরে যেতে আওয়ামী লীগের আল্টিমেটাম সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল বলেন,  যেহেতু তারা জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় বসেনি, জবরদখল করে ক্ষমতায় বসে আছে, তাদের লক্ষ্যই হচ্ছে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করা। এজন্য বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করে এসব প্রতিষ্ঠানকে ধবংস করে দিয়ে তারা একটা নৈরাজ্য সৃষ্টি করে সেই লক্ষে এগিয়ে যেতে চায়। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে আদালত অবমাননার শামিল বলে মনে করেন কি না প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই নিঃসন্দেহে।’ এক প্রশ্নের জবাবে ফখরুল বলেন, ‘রাষ্ট্রের তিনটি প্রতিষ্ঠান যদি একটা আরেকটার সাথে সাংঘর্ষিক অবস্থায় থাকে তাহলে কোনোভাবে শুভ লক্ষণ নয়। দুঃখজনক হলো আজকে সরকারপ্রধান যিনি নির্বাহী বিভাগের প্রধান তিনি নিজে বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে বিষোদগার করছেন এবং বিচার বিভাগকে সরকারের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। তিনি (প্রধানমন্ত্রী) বলছেন, বিচার বিভাগকে বালকসুলভ না হওয়ার জন্য। ‘আমার তো মনে হচ্ছে যে এটা অর্বাচীনের মতো কাজ করা হচ্ছে। যেভাবে আক্রমণাত্মক হয়েছেন তারা (সরকার), যে কথাগুলো বলছেন, যে উক্তিগুলো করছেন এটা কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এই ধরনের উক্তি কেউ কল্পনাও করতে পারে না।

দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, ‘এটা একটি নজিবিহীন। দেশের একজন প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রের একটি নিরপেক্ষ স্তম্ভ বিচার বিভাগ সম্পর্কে ও প্রধান বিচারপতি সম্পর্কে এ ধরনের মন্তব্য করতে পারেন না। এটা কোথাও দুনিয়ার কোনো দেশে সম্ভবপর নয়। আমার মনে হয়, উনি (শেখ হাসিনা) যদি সত্যিকার অর্থে নির্বাচিত হতেন, তা হলে এরকম মন্তব্য তিনি করতেন না, উনি নির্বাচিত নন বলেই তার পক্ষে এসব কথা বলা সম্ভবপর হয়েছে।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর অপসারণের ঘটনার উদাহরণ টেনে প্রধান বিচারপতি যে মন্তব্য করেছেন তাকে কিভাবে দেখছেন প্রশ্ন করা হলে মওদুদ বলেন, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ করতে হয়েছে। পাকিস্তানের প্রতি কারো ভালোবাসা থাকার কথা নয়। এখানে প্রধান বিচারপতি পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের কথা বলেছেন যে, সেই উচ্চ আদালত পাকিস্তানের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে সরিয়ে দিয়েছেন সেটা উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী সেই রায় মেনে নিয়েছেন। এই যে স্পিরিটটা এই স্পিরিটের কথা আমাদের প্রধান বিচারপতি বলেছেন। এটার সঙ্গে পাকিস্তানের সাথে ভালোবাসা থাকার তুলনা করার অবকাশ নেই। এটা একেবারে ইচ্ছাকৃতভাবে করা হয়েছে ম্যালাইন করার জন্য। আমাদের সুপ্রিম কোর্ট বলেছেন, তারা অনেক ধৈর্য দেখিয়েছেন। কারণ সুপ্রিম কোর্ট তো চায় না প্রশাসনের সঙ্গে কোনো সংষর্ষে যেতে। আজকে যদি তারা চাইতেন এদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা হতো এবং সুয়োমোটো রুল ইস্যু করে তাদেরকে আদালতে এনে একটা বিচারের ব্যবস্থা করতে পারতেন, কিন্তু করেননি। আমি মনে করি যে, সেদিক থেকে সুপ্রিম কোর্ট যে সংযমের পরিচয় দিয়ে আসছেন, সেটা প্রশংসনীয়।

সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, ভাইস চেয়ারম্যান আহমেদ আজম খান, নিতাই রায় চৌধুরী, কেন্দ্রীয় নেতা আতাউর রহমান ঢালী, শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানি  প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।