(বিএনপি কমিউনিকেশনস)   — বুধবার, সেপ্টেম্বর ৬, রাজধানীর নয়াপল্টন বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে প্রেসব্রিফিং এ দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, তেলের দাম কমছে তবু সরকার বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে জনজীবন দুর্বিষহ করে তুলছে

প্রেসব্রিফিং এর পূর্ণ পাঠ নিচে তুলে দেয়া হলো –  

প্রিয় সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা,

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমলেও বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম অতিশয় চড়া, এর উপর আবারও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করার প্রস্তুতি চলছে। গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে কিছু দিনের মধ্যে দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমায় বাংলাদেশে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচও কমার কথা। কিন্তু বিদ্যুতের দাম না কমিয়ে উল্টো বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে, যা নজিরবিহীন এবং গণবিরোধী। বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত জ্বালানি (ফার্নেস) তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করা হলে খরচ আরও কমবে। বিদ্যুতের মুল্য বৃদ্ধির মূল কারণ হচ্ছে কুইক রেন্টলের বিদ্যুৎ। রেন্টাল-কুইক রেন্টাল হচ্ছে আমাদের অর্থনীতির জন্য অভিশাপ। এসব প্রকল্পের পিছনে জড়িত ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতাদের আত্মীয়স্বজন। তাদের লুটপাটের আরও বেশি সুযোগ করে দিতেই বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। বিদ্যুৎ-জ্বালানি এখন লুটের খাত। সরকার তার পছন্দের  লোকদের দিয়ে রেন্টাল-কুইক রেন্টাল প্রজেক্ট করিয়েছে। ওইসব প্রজেক্টে জনগণের দেয়া ট্যাক্স থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে। তাতেও কূল পাচ্ছে না। এখন আবারও দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের পকেট কাটার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। গরিবকে আরও গরিব বানাতে চাচ্ছে সরকার।  

গত দেড় বছরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমেছে ৮০ শতাংশের বেশি। কিন্তু দেশে এখন পর্যন্ত কমানো হয়নি। এমনকি সরকার কমানোর কথা ভাবছেও না। ফলে দাম কমার সুবিধা থেকে দেশ বঞ্চিত হচ্ছে। বর্তমানে দেশে প্রতি লিটার অকটেনের উৎপাদন খরচ ৫০ টাকারও কম। সরকার বিক্রি করছে ৯৯ টাকা। পেট্রলের উৎপাদন ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যেও ব্যবধান প্রায় একই রকম। সরকার দেশে ডিজেল বিক্রি করছে ৬৮ টাকা লিটার। অথচ ডিজেলের আমদানি মূল্য পড়ছে প্রতি লিটার ৪০ টাকার কম। বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত ফার্নেস তেল সরকার বিক্রি করছে প্রতি লিটার ৬২ টাকা। ক্রয়মূল্য বর্তমানে ২৫ টাকার মতো।

বিদ্যুতের সঙ্গে সব কিছু সম্পর্কিত। ২০১০ সাল থেকে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছয় বছরে পাইকারি পর্যায়ে ছয়বার এবং খুচরা পর্যায়ে সাতবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি পেলে সবচেয়ে বিপাকে পড়বে সীমিত আয়ের মানুষ। শিল্প খাতেও পড়বে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রভাব। এমনিতে সরকারের লুটাপাট আর ভয়াবহ দুঃশাসনে দেশে কোন বিনিয়োগ নেই। এমন সময় বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করা মানেই বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করবে। এতে গোটা অর্থনীতি হুমকির মুখে পড়বে। আবার শিল্পে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে বাড়বে দ্রব্যমূল্যও। নিত্যপণ্যসহ সব কিছুর দাম বৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষ দিশেহারা। এর মাশুলও দিতে হবে সাধারণ ভোক্তাদের। এমনিতেই মূল্যস্ফীতি অব্যাহতভাবে বাড়তে থাকায় মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়ের আকার স্ফীত থেকে স্ফীততর হচ্ছে। এর ফলে নির্দিষ্ট আয় ও পেশার মানুষের কষ্ট ক্রমাগতভাবে বেড়েই চলেছে। এরপর আবার বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ব্যয়ভার স্ফীত করার মাধ্যমে দুর্ভোগের মাত্রা বাড়িয়ে দেবে। কৃষি খাতেও এর বিরূপ প্রভাব পড়বে।

বন্ধুরা,

বর্তমান ভোটারবিহীন সরকার জনগনের ভোটে নির্বাচিত না হওয়ায় জনগনের প্রতি তাদের কোন দায়িত্ববোধ নেই। তারা একের পর পর জনবিরোধী কার্যকলাপ অব্যাহত রেখেছে। বর্তমানে দেশের অর্থনীতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। এমন বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি মেনে নেয়া হবে না। আমি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির পক্ষ থেকে বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির উদ্যোগের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি এবং অবিলম্বে জনবিরোধী এ উদ্যোগ থেকে সরে আসার আহবান জানাচ্ছি।

প্রিয় সাংবাদিক ভাই বোনেরা,

এই পবিত্র ঈদুল আজহার উৎসবের মাঝেও শাসক দল আওয়ামী লীগ ও তাদের পেটোয়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সন্ত্রাসী তান্ডব থামছেনা। ঈদের আগে ২০দলীয় জোটের কল্যানপার্টির মহাসচিব এম এম আমিনুর রহমান, ব্যবসায়ী ও বিএনপি নেতা সাদাত আহমেদসহ ৬জনকে অপহরণ করা হলেও এখনও তাদের ফেরত দেয়া হয়নি। পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার তুষখালী বাজার থেকে ধানীসাফা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান তালুকদারকে (৫৮) প্রকাশ্য তুলে নিয়ে যাওয়ার একদিন পর তার লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। সোমবার মধ্যরাতে উপজেলার তুষখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পেছন থেকে হাবিবুর রহমানের লাশ উদ্ধার করা হয়। এর আগে রোববার সকালে তুষখালী বাজারে একটি ওষুধের দোকানে বসা অবস্থায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ইদ্রিস তালুকদারের নেতৃত্বে ১০/১৫ জন তাকে তুলে নিয়ে যায়। পরে তাকে আওয়ামী নেতারা নৃশংসহভাবে হত্যা করে লাশ ফেলে রেখে যায়। আমি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের পক্ষ থেকে এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে অবিলম্বে হাবিবুর রহমানের খুনীদের গ্রেফতারের জোর দাবি জানাচ্ছি। একই সঙ্গে তার শোক সন্তপ্ত পরিবারের সমবেদনা জানাই গভীর সমবেদনা।

বন্ধুরা,

রূপসা উপজেলায় বিএনপির ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান পুলিশ ভ-ুল করে দিয়েছে। জেলা ও বিভিন্ন উপজেলার আমন্ত্রিত অতিথিরা রোববার অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত হলে রূপসা থানার ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘৫ মিনিটের মধ্যে জায়গা ফাঁকা করতে হবে, অন্যথায় গুলি করা হবে।  ঈদের পর দিন রোববার আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে বিএনপি নেতাকর্মীসহ অতিথিরা অনুষ্ঠানে জড়ো হতে শুরু করলে ওসি রফিকুল ইসলাম জলকামান ও অতিরিক্ত ফোর্স নিয়ে অনুষ্ঠানস্থলে হাজির হয়ে তাতে বাধা দেন। এ সময় বিএনপি নেতাকর্মীদের হুমকি দিয়ে ওসি রফিকুল বলেন, পাঁচ মিনিটের মধ্যে জায়গা ফাঁকা করতে হবে, অন্যথায় গুলি করা হবে।

গতকাল মাদারীপুরে বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ সম্পাদক ও সাবেক ছাত্রনেতা আনিসুর রহমান তালুকদার খোকন ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান করতে গেলে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা বাধা প্রদান করে। পরে পুলিশ বাদী হয়ে উল্টো বিএনপির ১০ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করে।

শরীয়তপুরে গত ৪ সেপ্টম্বর বিএনপির ত্রাণ বিতরণে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ যৌথ নগ্ন হামলা চালিয়েছে। জেলা বিএনপির সভাপতি শফিকুল ইসলাম কিরণের সার্বিক তত্ত্বাবধানে সখিপুর থানার উত্তর তারাবুরিয়া ইউনিয়নে নদী ভাঙ্গন ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ২৭৫টি পরিবারকে পূর্ব নির্ধারিত ত্রাণ বিতরণে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ পরিকল্পিতভাবে হামলা করেন। সহকারী পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে এ হামলার ঘটনা ঘটে। এ সময় হামলায় ১৪/১৫জন নেতা-কর্মী আহত হয়। এছাড়াও আব্বাস আলী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জেলা বিএনপির র্নিধারিত ত্রাণ বিতরণস্থানে ছাত্রলীগের ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানের নাটক সাজিয়ে পুলিশ ত্রাণ দেওয়ার স্টেজটি ভেঙে দেয় এবং নেতা-কর্মীদের উপর হামলা করে। এ সময় পুলিশ ও আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হামলায় বিএনপির আরও ৪/৫ নেতা-কর্মী আহত হয়েছে। বিভিন্ন পয়েন্টে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নগ্ন হামলায় মোট ২৭জন নেতা-কর্মী আহত হয়।

গাজীপুরের কালিগঞ্জ উপজেলার বক্তারপুর ইউনিয়ন বিএনপি সভাপতি রফিজুল ইসলাম দর্জ্জির বাড়িতে ৪ সেপ্টেম্বর ঈদ উত্তর পূনর্মিলনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। এই অনুষ্ঠানে বিএনপি ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও জেলা বিএনপি সভাপতি ফজরুল হক মিলন-এর প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা ছিল। কিন্তু প্রধান অতিথি অনুষ্ঠানস্থলে যাবার পূর্বেই ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সশস্ত্র ক্যাডাররা আক্রমণ করে বাড়ির সব আসবাবপত্র ভেঙ্গে ফেলে আলমারির সমস্ত কাপর-চোপর, গহনা, টাকা-পয়সা লুট করে নিয়ে যায়। সন্ত্রাসীরা বাড়ির মহিলা, পুরুষ সবাইকে নির্বিচারে পিটিয়ে আহত করে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। হামলায় সাবেক ইউপি সদস্য আমিনুরকে বেদম প্রহার করে। পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে।

গত পরশু চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলা চেয়ারম্যান নূরুল আমীন তার বাসায় ঈদ পূনর্মিলনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। পুলিশ উক্ত অনুষ্ঠান পন্ড করে দিয়ে বেধড়ক লাঠিপেটা করে সবাইকে তাড়িয়ে দেয় এবং ঘটনাস্থল থেকে ৪ জনকে গ্রেফতার করে। উপরন্ত পুলিশ উপজেলা চেয়ারম্যান নূরুল আমীনকে ১নং আসামী করে বড়ৈহাট পৌর বিএনপি সভাপতি দিদারুল আলম, মীরের সরাই যুবদল সভাপতি শাহিনুর ইসলাম স্বপনসহ ৫০ জনকে আসামী করে মামলা দায়ের করেছে।

মীরের সরাইয়ে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা  বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীদের যেখানে পাচ্ছে বেধড়ক মেরে তাড়িয়ে দিচ্ছে। সমগ্র মীরসরাইয়ে এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে।

আমি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের পক্ষ থেকে এসব ন্যাক্কারজনক ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে অবিলম্বে দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি দাবি করছি এবং মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের জোর দাবি জানচ্ছি।

সাংবাদিক বন্ধুরা

মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নিধনের বিরুদ্ধে বিশ্বনেতৃবৃন্দ সোচ্চার ভুমিকা পালন করলেও, বিশ্ব বিবেককে জাগ্রত করলেও সরকার এখনও উদ্যোগি ভুমিকা নেয়নি। সীমান্তে লাখ লাখ রোহিঙ্গা এখনও মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করলেও তাদের প্রবেশ করতে দিচ্ছে না সরকার। নাফ নদীর তীরে বাংলাদেশে আশ্রয় পাওয়ার জন্য তারা বুকফাঁটা কান্নায় তারা আকুতি জানাচ্ছে। মিয়ানমারে তাদের উপর চলছে পৈশাচিক নির্যাতন, হত্যা করার পর তাদের হাত-পা বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে। খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে শরীর থেতলিয়ে দেওয়া হচ্ছে ধর্ষণের পর নারীদের। জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হচ্ছে মানুষ ও পশুদের। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এক বিভৎস বর্বরতার নতুন নজির তৈরি করেছে রোহিঙ্গাদের উপর মিয়ানমারের নির্যাতন। যারা কাঁটা তারের বেড়া ডিঙ্গিয়ে প্রবেশ করছে তারা তীব্র খাদ্য সংকটে ভুগছেন। না খেয়ে ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে তারা অসুস্থ হয়ে পড়লেও চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেনা। আহত, গুলিবিদ্ধ,ক্ষুধার্ত, অসুস্থ, বিবস্ত্র, ছায়াহীন তপ্তরোদ্রের মধ্যে চরম এক বিপর্যয়ের মধ্যে তারা দিনাতিপাত করছে। এই মানবতাবিরোধী ভয়ংকর নির্দয়তার বিরুদ্ধে বর্তমান সরকারের বিবেকহীন নিরবতা বিশ্ববিবেককে স্তম্ভিত করেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে র্বতমান সরকারের কূটনৈতিক দূর্বলতা ফুটে উঠেছে। যার কারণে রোহিঙ্গা সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। আমরা আবারও দলের পক্ষ থেকে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহন করে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা বিধানের জোর দাবি জানাচ্ছি।

সকলকে ধন্যবাদ।