(বিএনপি কমিউনিকেশন)   — বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি’র সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ৭, ২০১৭ সকালে নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে প্রেসব্রিফিং এ বলেছেন, বর্তমানে রাষ্ট্রের ছত্রছায়ায় এ সকল গুম সংঘটিত হচ্ছে। যা ক্ষমাহীন ও মানবতাবিরোধী ঘৃণ্য অপরাধ।

প্রেসব্রিফিং এর হাইলাইট –

  • রংপুর সিটি নির্বাচনে ১৯৬টি কেন্দ্রের মধ্যে ১৩৩টিই ঝুঁকিপূর্ণ
  • সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের লোকদের আত্মীয়স্বজনরা ব্যাংক কেলেঙ্কারিতে জড়িত
  • বিরোধীদের প্রতি অন্ধ হিংস্রতা থেকেই সরকারের পশু প্রবৃত্তির বহি:প্রকাশ হচ্ছে গুম
  • বিএনপি নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও বানোয়াট মামলা প্রত্যাহার করতে হবে

নিচে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এর প্রেসব্রিফিং এর পূর্ণপাঠ দেয়া হলো –

সুপ্রিয় সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা,

আস্সালামু আলাইকুম। সবার প্রতি রইল আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা ও কৃতজ্ঞতা।

আপনারা জানেন-আগামী ২১ ডিসেম্বর রংপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ইতিমধ্যে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে ১৯৬টি কেন্দ্রের মধ্যে ১৩৩টিই ঝুঁকিপূর্ণ। নির্বাচন কমিশন দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে না। আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী বারবার আচরণ বিধি লঙ্ঘন করলেও ইসি তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না। ক্ষমতাসীন দলের লোকেরা গোটা এলাকায় ভয়ভীতি ছড়াচ্ছে বলেও প্রার্থীরা অভিযোগ করেছেন। এমনকি ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীকে শুরু থেকে যেভাবে হয়রানী করা হয়েছে তাও নজিরবিহীন।  আমরা আবারো নির্বাচন কমিশনকে বলতে চাই-ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীকে পেছনের দরজা দিয়ে জেতানোর কোন চেষ্টা করলে জনগণ সেটির উপযুক্ত জবাব দিবে।

বন্ধুরা,

রংপুর সিটি নির্বাচনে এখনও অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহনযোগ্য নির্বাচনী পরিবেশ এখনও করতে পারেনি ইসি। নির্বাচনী মাঠে প্রচারণায় সকল প্রার্থীর সমান সুযোগ তৈরি হয়নি। ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবে ভোটাররা এখনও ভয়ভীতির মধ্যেই রয়েছেন। এমন অবস্থায় রংপুর সিটি নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে কী না এ ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। আমি বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির  পক্ষ থেকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ তৈরির জোর দাবি জানাচ্ছি। একই সঙ্গে ম্যাজিট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে সেনাবাহিনী মোতায়েনেরও জোর দাবি জানাচ্ছি। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের নেতৃত্বে কমিশনের উর্দ্ধতন ব্যক্তিদের মানসিকতা স্বাধীন না হলে কমিশনের আইনী স্বাধীনতা কোন কাজে আসে না।

সাংবাদিক বন্ধুরা,

আপনারা দেখেছেন বেসিক ব্যাংকে দুর্নীতি ও কেলেঙ্কারির বিষয়টি জনসম্মুখে স্পষ্ট হয়ে উঠলেও ক্ষমতাসীন দলের লোকেরা জড়িত থাকায় দুদক বরাবরই সেটি এড়িয়ে গেছে। বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারী নিয়ে এখন পর্যন্ত ৫৭টি মামলা হলেও মূল হোতারা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। আমরা জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি’র পক্ষ থেকে বারবার ব্যাংক লুটপাটে জনগণের অর্থ আত্মসাতের কথা জাতির সামনে তুলে ধরলেও অত্যুগ্র ক্ষমতার প্রভাবে সরকার বরাবরই তাতে কর্ণপাত করেনি। যদিও উচ্চ আদালতের নির্দেশে এখন নতুন করে বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করছে দুদক। এতে প্রতীয়মান হয় যে, আমরা বারবার যে অভিযোগগুলো উত্থাপন করেছিলাম তা ছিল তথ্যমূলক। সর্বমহলে একটি কথা রটনা আছে-সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের লোকদের আত্মীয়স্বজনরা এই কেলেঙ্কারীতে জড়িত। শুধু বেসিক ব্যাংক নয়, রাজকোষ কেলেঙ্কারিসহ সমস্ত আর্থিকখাতে যে লুটপাট হয়েছে এর পিছনে সরকারের রাঘববোয়ালরা জড়িত। ব্যাংক লুটের লাখ লাখ কোটি টাকা দেশ থেকে পাচার হয়ে গেলেও দুদক এসব বিষয়ে নির্বিকার। কিন্তু জনগণ তাদের ক্ষমা করবে না। লুটেরাদের একদিন জনতার কাঠগড়ায় দাঁড়াতেই হবে।

বন্ধুরা

সারাদেশে নিখোঁজ অর্থাৎ বেআইনী গুম আতংক থামছেই না। সমাজের সকল স্তরের মানুষ আজ কেউই নিরাপদ নয়। দেশ যেন এখন হালছাড়া জাহাজের মতোই লক্ষ্যভ্রষ্ট। ক্ষমতা বিকৃতি যখন কদর্য হয়ে ওঠে তখন জনসমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষকে সইতে হয় বিভিষিকাময় নির্মমতা। এবার রাজধানী থেকে নিখোঁজ হয়েছেন ভিয়েতনামে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান। এ ঘটনায় তার মেয়ে ধানমন্ডি থানায় ডায়েরী করলেও এখনও তাঁর কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি। এরপর পরিবারের সদস্যরা মারুফ জামানকে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও না পেয়ে অবশেষে মঙ্গলবার সকালে ধানমন্ডি থানায় জিডি করেন। সারাদেশে সাম্প্রতিক সময়ের আলোচিত নিখোঁজের সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এটি। একজন ব্যক্তি অপরাধী হলে তার আইনী প্রক্রিয়ায় বিচার হতে পারে, যেটি হবে প্রকাশ্য  নিয়মমাফিক পদ্ধতিতে। কিন্তু সেই ব্যক্তিকে অদৃশ্য করে দেয়া হলে তা হবে ভয়ঙ্কর অপরাধ। বর্তমানে রাষ্ট্রের ছত্রছায়ায় এ সকল গুম সংঘটিত হচ্ছে। যা ক্ষমাহীন ও মানবতাবিরোধী ঘৃন্য অপরাধ।

বন্ধুরা

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, ছাত্র ও সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার অনেক মানুষের আর খোঁজ মিলছে না। সাম্প্রতিক সময়ে এমন ঘটনার প্রবণতা অনেকটাই বেড়ে গেছে। তাই এ নিয়ে দেশব্যাপী বিরাজ করছে এখন চরম এক আতঙ্ক। পরিস্থিতি এমন যে, কেউ এখন ঘর থেকে বের হলেই গুম হয়ে যাওয়ার ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত থাকেন। নিখোঁজের এসব ঘটনায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জড়িত বলে অভিযোগ করছেন নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের দিকে আঙ্গুল তুলে ভুক্তভোগী এসব পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেন, তারা তাদের পরিচয় পত্র না দেখিয়েই জোরপূর্বক ধরে নিয়ে যান। কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, কেন নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তার উত্তরও তারা দেন না। তুলে নিয়ে যাওয়ার পরেই পরিবারের ওই সদস্যের সন্ধানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্বারস্থ হলেও আশানুরূপ ফল পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ ভূক্তভোগী পরিবারগুলোর। এমন অভিযোগ তুলেই নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনরা বলেন, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর এমন আচরণের কারণেই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া নিখোঁজের এসব ঘটনাগুলোর শিকার ব্যক্তিরা সহসা ফিরে আসতে পারেন না।  

সাম্প্রতিক সময়ে প্রতি মাসেই রাজধানী থেকে কোনো না কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছেন এমন তথ্যের ভিত্তিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গণমাধ্যমকে বলেন, অনেকে ইচ্ছা করেই আত্মগোপনে গিয়ে সরকারকে বিব্রত করছেন। গুমকে বৈধতা দিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য স্বীকারোক্তিমুলক। অতএব তার বক্তব্যেই প্রমানিত হয়-এবারের আওয়ামী সরকারের আমলে সকল গুমের জন্য সরকারই দায়ী। সরকার বিরোধীদের প্রতি অন্ধ হিংস্রতা থেকেই সরকারের বিকৃত রুচির পশু প্রবৃত্তির বহি:প্রকাশ হচ্ছে বেআইনী গুম।

সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা,

বিএনপি’র যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ-এর সভাপতি হাবিব উন নবী খান সোহেল, যুবদল সভাপতি সাইফুল আলম নীরব, সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি’র সহ-সভাপতি নবীউল্লাহ নবী, আরিফুল ইসলাম আরিফ, মহানগর দক্ষিণ বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক এম এ হান্নান, সহ-সভাপতি সিরাজুল ইসলাম সিরাজ, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম, যুগ্ম সম্পাদক রবিউল আলম রবি, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি’র প্রচার সম্পাদক ভিপি হানিফ এবং ২০ ওয়ার্ড বিএনপি সভাপতি জাহিদ হোসেন নোয়াব এর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। এছাড়া গতকাল নয়াপল্টনস্থ বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে ঢাকা মহানগর বিএনপি নেতা ও জাতীয়তাবাদী মৎস্যজীবী দলের নেতা নাদিম এবং জাহাঙ্গীর আলম সনিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

আমি জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি‘র পক্ষ থেকে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ-এর সভাপতি হাবিব উন নবী খান সোহেল, যুবদল সভাপতি সাইফুল আলম নীরব, সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকুসহ সকল নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও বানোয়াট মামলা দায়েরের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের জোর দাবি করছি। পাশাপাশি গ্রেফতারকৃত মৎস্যজীবী দল নেতা নাদিম এবং জাহাঙ্গীর আলম সনি এর বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার ও নি:শর্ত মুক্তির জোর দাবি জানাচ্ছি।

ধন্যবাদ সবাইকে। আল্লাহ হাফেজ।