কাদের গনি চৌধুরী

বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে তিন জন নারী ও শিশু ধর্ষিত হচ্ছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে বিদায়ী বছর অর্থাৎ ২০১৭ সালে সবচেয়ে বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। একইসঙ্গে বেড়েছে নিষ্ঠুরতা ও ভয়াবহতা। এসব ভয়ংকর তথ্য দিয়েছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন।

বাংলাদেশে ২০১৭ সালে মোট ১ হাজার ২৫১টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ২২৪ জন নারী ও শিশু। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৫৮ জনকে। এসময়ে ধর্ষণসহ অন্যান্য নির্যাতনের মোট ঘটনা ঘটেছে ৫ হাজার ২৩৫টি। এমন তথ্য দিয়েছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ব্র্যাকের হিসাব অনুযায়ী গতবছর থেকে এই বছর নারী নির্যাতনের হার বেড়েছে ৫৮ শতাংশ। চলতি বছরের অক্টোবর মাস পর্যন্ত নারী নির্যাতনের সংখ্যা ৯ হাজার ১৯৬টি। এর মধ্যে ৬৮ ভাগ ঘটনাই নথিভুক্তই হয়নি। সবধরনের নির্যাতনকে ছাপিয়ে গেছে ধর্ষণ ও ধর্ষণ পরবর্তী নিষ্ঠুরতার ঘটনাগুলো। চলতি বছরে সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী ধর্ষণের ঘটনা ১ হাজার ৭৩৭ টি। শুধু তাই নয় শিশু ধর্ষণ এবং ধর্ষণের পরে হত্যার ঘটনা এ বছর বৃদ্ধি পেয়েছে ভয়ঙ্করভাবে। বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৩৯৯ জন শিশুকে ধর্ষণ করা হয়, যাদের মধ্যে ৫৮ শিশু হয়েছে গণধর্ষণের শিকার এবং এদের মধ্যে ৩৭ জন প্রতিবন্ধী শিশু।

অন্যদিকে আইন ও সালিশ কেন্দ্র – আসক জানিয়েছে ২০১৭ সালে সারা দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৮১৮ জন নারী ও শিশু। এর আগের বছর এ সংখ্যা ছিল ৫৫৯। বিদায়ী বছরের তুলনায় গত বছর ২৫৭ জন নারী ও শিশু বেশি নির্মমতার শিকার হয়েছে।

আঁতকে উঠার মতো তথ্য দিয়েছে ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন। সংস্থাটির এক রিপোর্ট বলা হয়েছে বাংলাদেশে প্রতিঘণ্টায় একজন করে নারী নির্যাতনের শিকার হয়।

মে ২০১৭, মাগুরায় ঘটেছে এক নির্মম ধর্ষণের ঘটনা। তিন বছরের প্রতিবন্ধীশিশু পুজা। এখনও মায়ের দুধ খাওয়া ছাড়েনি। এ মাছুম বাচ্চাটিও ধর্ষক নামের পশুদের হাত থেকে রেহায় পায়নি। ব্লেড দিয়ে কেটে গোপানাঙ্গ বড় করে তিন বছরের এ প্রতিবন্ধী শিশুকে ধর্ষণ করা হয়। মাগুরা শহরের ঋষিপাড়ায় মানসিক প্রতিবন্ধী ওই সকালে মেয়েটিকে বাড়িতে রেখে মেয়েটির মা-বাবা মাগুরার মোহম্মদপুর উপজেলার মলগাতি এলাকায় এক নিকটাত্মীয়ের বাড়িতে যায়। দুপুর তিনটার দিকে একাকী বাড়িতে মেয়েটিকে চিৎকার করতে দেখে প্রতিবেশীরা বাড়ির দেওয়াল ডিঙ্গিয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকে তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে।

ডিসেম্বর ২০১৭, ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে প্রতিবেশী এক বখাটে তরুণ এক নারী পোশাককর্মীকে ধর্ষণের পর যৌনাঙ্গ ব্লেড দিয়ে কেটে রক্তাক্ত জখম করেছে।

আগষ্টের প্রথম সপ্তাহে ছাত্রলীগের ৪ নেতা মিলে এক তরুণীকে রাতভর ধর্ষণের পর হত্যা করে। ওই তরুণীকে ধর্ষণের পর হত্যার করে লাশ গুমের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতারকৃত চার ছাত্রলীগ নেতাকে সাময়িক বহিষ্কার করেছাত্রলীগ। এধর্ষণ ও হত্যায় জড়িতরা হলেন- পাথরঘাটা কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি রুহি আনান দানিয়াল (২২), সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন ছোট্ট (২১), সাংগঠনিক সম্পাদক মাহিদুল ইসলাম রায়হান (১৯) ও উপজেলা ছাত্রলীগের সহসম্পাদকমো. মাহমুদ (১৮)।

গত ২৫ আগস্ট বগুড়া থেকে ময়মনসিংহ যাওয়ার পথে রূপা খাতুনকে চলন্ত বাসে পরিবহনশ্রমিকেরা গধর্ষণ করেন। পরে তাঁকে হত্যা করে টাঙ্গাইলের মধুপুর বন এলাকায় ফেলে রেখে যায়।

বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার চরাদি ইউনিয়নে ধর্ষণের শিকার হয়ে লজ্জায় নিজের শরীরে কোরোসিন ঢেলে আগুন দিয়েছিল স্কুলছাত্রী সোনিয়া (১৩)। পাঁচদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ১ জানুয়ারি রোববার বিকেলে ঢাকা মেডিকেল কলেজহাসপাতালে মৃত্যু হয় সোনিয়ার।

শরীয়তপুরে ছাত্রলীগের এক প্রতাপশালী নেতার হাতে অসংখ্য মা-বোন ধর্ষিত হন। শুধু ধর্ষণই নয়, ধর্ষণের ভিডিও ধারণ করে তা ফাঁস করার ভয় দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করতো। কেউ টাকা না দিলে ফেসবুকে ধর্ষণের ভিডিওপ্রকাশ করতো।ব্যাপক অভিযোগের পর সম্প্রতি ওই ধর্ষককে পুলিশ গ্রেফতার করে। ছয় নারীকে ধর্ষণ ও অশ্লীল ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়ার ঘটনায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে শরীয়তপুরের ওই ছাত্রলীগ নেতাআরিফ হাওলাদার।

ভেদরগঞ্জ উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আরিফ হাওলাদার ছয় নারীকে ধর্ষণ ও অশ্লীল ভিডিও করেন। ভেদরগঞ্জ ইউনিয়নের নারায়ণপুর ইউনিয়নের ইকরকান্দি গ্রামের আমিনুল হক মাদবরের ছেলে রাজিব মাদবরের ফেসবুক থেকে এসব ভিডিও ও ছবি পোস্ট করে ছড়িয়ে দেয়া হয়। ছাত্রলীগ নেতা আরিফ হাওলাদার গোপনে ছয় নারীর আপত্তিকর ছবি ভিডিও করে এবং ওই ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে তাদের ধর্ষণ করে। আবারএসব ধর্ষণের চিত্র গোপনে মোবাইলে ধারণ করে। লোকলজ্জার ভয়ে ধর্ষণের শিকার নারীরা এসব কথা কাউকে না বললেও সম্প্রতি ওসব ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওগুলোতে গৃহবধূ ও কলেজছাত্রীসহ ৬ নারীর সঙ্গে আরিফকে আপত্তিকরঅবস্থায় দেখা যায়।
এ ঘটনায় ১০ নভেম্বর সংগঠন থেকে আরিফকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করে শরীয়তপুর জেলা ছাত্রলীগ।

বরিশাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি (আইএইচটি) কলেজের ছাত্রী সাদিয়া আক্তার (২১)। প্রেমিক সিরাজুল ইসলাম তার বন্ধুদের নিয়ে গণধর্ষণের পর হত্যা করে সাদিয়াকে। হত্যার পর মরদেহ খালে ফেলে দেয় প্রেমিক ও তার সহযোগীরা।

কিছুদিন আগে রংপুর মহানগরীর মন্থনায় এক গৃহবধূকে ধর্ষণের পর তার মাথার চুল কেটে দেয় ধর্ষকের লোকেরা। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ওই গৃহবধূ বর্তমানে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

রাজশাহীতে স্বামীকে বেঁধে রেখে তার স্ত্রীকে সন্ত্রাসীরা ধর্ষণ করে। একই দিনে নোয়াখালির সুবর্ণচর উপজেলার চরবাটা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কর্তৃক এক তরুণী ধর্ষিত হয়। ধর্ষিতা প্রতারণার বিচার চাইতে গেলে উল্টো আটকে রেখে চেয়ারম্যানতাকে ধর্ষণ করে।

বগুড়ায় ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশ করায় ধর্ষিতা কিশোরী ও তার মাকে লাঠিপেটা করে মাথা ন্যাড়া করে দেয় সরকারি দলের তুফান ও তার দোসর ক্যাডাররা।

গাজীপুরের শ্রীপুরে মেয়ের নির্যাতনের বিচার না পেয়ে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে বাবা-মেয়ে আত্মহত্যা করেছে। নিহতরা হলো গোসিংগা ইউনিয়নের কর্নপুর গ্রামের হযরত আলী (৪৫) ও তার কন্যা আয়েশা আক্তার (১০)।

কিছু দিন আগের ঘটনা। বুড়িগঙ্গার ওপারে আত্মীয়ের বাড়ীতে বেড়াতে যাচ্ছিল দুই যুবতী । মেয়ে দু’টি ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্রী আর ভাতিজা নবম শ্রেণীতে পড়ে। সেই নৌকায় দুজন যুবক উঠল। অন্য যাত্রীদের সামনেই যুবকগুলো যুবতী দুটিকেঅত্যন্ত অশালীন আচরণে উত্ত্যক্ত করতে লাগল। তা দেখে ভাতিজা প্রতিবাদ করল। যুবক দুজন ভাতিজাকে ধাক্কা দিয়ে নদীতে ফেলে দিল। সে সাঁতার জানত না। সে পানিতে ডুবে গেল, তাকে উদ্ধার করা গেল না। মেয়ে দুটি কাঁদতে লাগল। নৌকারযাত্রীরা ছেলে দুটিকে ধরে থানায় নিয়ে গেল। ছেলে দুটি ছাত্রলীগের নেতা জানতে পেরে ওসি সাহেব কেস তো নিলেনই না, তাদের উত্তম নাস্তা করিয়ে কেউ যাতে তাদের ওপর হামলা করতে না আসে তার জন্য দুজন সশস্ত্র সিপাইকে সঙ্গে দিয়ে বাড়ীতেপাঠিয়ে দেন। ভাতিজার লাশটি চারদিন পর বুড়িগঙ্গায় ভাসতে দেখা যায়।

চট্টগ্রামে বাপ-ভাইকে গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখে এক মেয়েকে যুবলীগের ৫ জনে পালাক্রমে ধর্ষণ করেছিল বাপ ভাইয়ের সামনেই। বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের সময় জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যাল্যে নির্লজ্জ ও বেহায়াপনার এমন এক ঘটনা ঘটেছিল যা পৃথিবীর আর কোন দেশে কখনো ঘটেছে বলে জানা যায়নি। তাহলো জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০০ ছাত্রীকে ধর্ষণ করে ধর্ষণের সেঞ্চুরি উদযাপন করেছিল ছাত্রলীগের হীরার টুকরো ছেলেরা। কিন্তু শাসকগোষ্ঠী এত বড় জঘন্যাচারের জন্য ওইনরপশুদের সামান্য তিরস্কার পর্যন্ত করেনি। উল্টো ধর্ষক মানিককে উচ্চপদে চাকরি দিয়েছিল। কিন্তু কেবল ১০০ জন নয়, ঐ সময়ের সকল ছাত্রী এবং তাদের অভিভাবকগণ পড়েছিলেন চরম সংকটে। তারা লজ্জায় না পারছিলেন আত্মীয়স্বজন-বন্ধু-বান্ধব ও দেশবাসীকে মুখ দেখাতে, না পারছিলেন মেয়েদের বিয়ে দিতে। সরকার তাদের সান্ত্বনা দান ও সাহায্য কল্পে কোন উদ্যোগই নেয়নি।

ডিজিটাল সরকার গদীতে বসার ক’মাস পরেই পিরোজপুরে ছাত্রলীগ নেতা টাইগার মামুন দশম শ্রেণীর এক ছাত্রীকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে। বন্ধুর সাহায্যে ধর্ষণরত নোংরা দৃশ্যের ভিডিও করে বাজারে ছাড়ে। এমন জঘন্য কাজ করার পরেও সরকারের তরফ থেকে তেমন কিছুই করা হয়নি ঐ নরাধমটিকে।

পত্রিকায় দেখলাম ইডেন কলেজ হোস্টেলে থাকা মেয়েদের দিয়ে জোর করে দেহব্যবসা করাচ্ছে, সরকারি দলের ছাত্রী নেত্রী জেসমিন শামীমা নিঝুম। বিশেষ করে তারা ১ম এবং ২য় বর্ষের ছাত্রীদের দিয়ে এ ব্যবসা চালাচ্ছে এবং প্রচুর অর্থ উপার্জন করছে। এদের খরিদ্দার হলো ছাত্রলীগ, যুবলীগ নেতারা ও এমপি, মন্ত্রী মহোদয়গণ। জেসমিন ছাত্রলীগের মেসে, যুবলীগের বাসায়, মন্ত্রী-এমপিদের বাড়ীতে মেয়ে সাপ্লাই দেয়। কয়েক দিন পূর্বে এক মেয়েকে এক মন্ত্রীর বাসায় যাবার জন্যে নির্দেশ দেয়। মেয়েটি রাজী না হলে এই বেয়াদবীর জন্য জেসমিন পতিতা জমাদারনীর মত তার দলবল নিয়ে মেয়েটিকে অনেক মারধর করে। আরেক মেয়েকে দেহ ব্যবসায় নামাতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হলে তাকে শিবিরের ছাত্রী বলে হল থেকে বের করে দেয়। মেয়েটির বক্তব্য হলো, আমি এবং আমার চৌদ্দগোষ্ঠী আওয়ামীলীগার।

বাংলাদেশে এক হাজারে মাত্র চারজন আসামি ধর্ষণের ঘটনায় সাজা পান।

দেশব্যাপী যে হারে ধর্ষণ ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে, তাতে উদ্বিগ্ন না হয়ে পারা যায় না। উদ্বেগের কারণটা এখানেই যে এর প্রতিকারের কোন উদ্যোগ নেই। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠে, এ কোন বর্বরতার মধ্যে আমরা অাছি?

  • লেখক – সাবেক যুগ্ম সম্পাদক, জাতীয় প্রেস ক্লাব, ঢাকা। তথ্য-গবেষণা বিষয়ক সহ সম্পাদক,  বিএনপি।