বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী মঙ্গলবার, ফেব্রুয়ারি ৬, দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক প্রেস ব্রিফিং-এ বলেছেন, “জনগণ ও নেতাকর্মীরা তীব্র আবেগে সরকারের পেটোয়া বাহিনীদের নৃশংস আক্রমণ সহ্য করেও প্রিয় নেত্রীকে একনজর দেখার জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়েছিল। এই দৃঢ়তা, এই প্রত্যয়, এই অটুট মনোবল, এই দুর্যোগ-দূর্বিপাককে উপেক্ষা, এই নিষ্ঠুর নির্যাতনকে আলিঙ্গন করার মধ্য দিয়ে প্রমানিত হয়-জাতীয়তাবাদী শক্তিকে নি:শেষ করা যাবে না।”

 

প্রেস ব্রিফিং-এর পূর্ণপাঠ নিচে দেওয়া হলোঃ

 

সুপ্রিয় সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা,
আস্সালামু আলাইকুম। সবাইকে জানাচ্ছি আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা ও কৃতজ্ঞতা।
বন্ধুরা,
আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর ভর করে সরকার তার স্বৈরাচারী গণতন্ত্রবিনাশী ইচ্ছা পূরণ করছে। সরকার রাষ্ট্রীয় শক্তিকে আয়ত্বে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা-সমাবেশ-ঘরোয়া বৈঠক-চলাচল এমনকি ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে সন্ত্রাসী তান্ডবে স্তব্ধ করে দিচ্ছে। অদক্ষতা, অযোগ্যতা, অহংকারে বছরের পর বছর দেশে আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক-প্রশাসনিক-বিচারিক নানামূখী সংকট পাকিয়ে তুলেছে। আর এই সংকট সৃষ্টির জন্য ষোল আনা দায়ী সরকার ও সরকার প্রধান।
গতকাল বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া হযরত শাহজালাল (রঃ) এঁর মাজার জিয়ারতের জন্য সিলেটে যান। এটি ছিল তাঁর সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তিগত সফর, মাজার জিয়ারত-যা ধর্মীয় অনুষ্ঠান। দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী বেগম জিয়া দেশের যে জেলাতেই যান না কেন, পথিমধ্যে হাজার মানুষ তাঁকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাঁর সিলেট যাবার পথে অভ্যর্থনা জানাতে অপেক্ষমান বিএনপি নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের ওপর আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারদলীয় অঙ্গসংগঠনের যৌথ আক্রমণে এক বিভিষিকাময় পরিস্থিতির সূচনা হয়। সরকারী বাহিনীগুলোর আক্রমণে বিএনপি নেতাকর্মীদের ক্ষমতবিক্ষত করা হয়, মৃত্যু ভয়ে উর্দ্ধশ্বাসে কেউ পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করলে তাকে টেনে হিঁচড়ে আটক করে পুলিশ ভ্যানে তোলা হয়। হবিগঞ্জে বেগম জিয়াকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য নেতাকর্মীরা একটি ছোট মঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে থাকলে পুলিশ অতর্কিতে হামলা চালিয়ে মঞ্চ ভেঙ্গে দিয়ে নেতাকর্মীদেরকে বেধড়ক মারপিট করা হয়। সরকারী বাহিনীর আক্রমণে নেতাকর্মীদের মাথা ফাটানো, অবিরাম ঘুষি-লাথি মেরে থেতলিয়ে জখম করা, অরুচিকর কুরুচিপূর্ণ গালিগালাজ করা, শার্টের কলার ধরে টেনে হিঁচড়ে গাড়ীতে তোলাসহ বিভৎস আক্রমণের দৃশ্য শুধু স্থানীয় মানুষরই নয়, গোটা জাতি তা অবলোকন করেছে আপনাদের গণমাধ্যমে। বাংলাদেশকে এখন একটি আদর্শ পুলিশী রাষ্ট্রে পরিণত করতে বর্তমান শাসকগোষ্ঠী সক্ষম হয়েছে। এখানে ক্ষমতাসীন নেতা-মন্ত্রী ও সরকারী বাহিনীগুলোর কোন রীতি নেই, কোন নীতি নেই, আইন নেই, কানুন নেই, বিনয় নেই, ভদ্রতা নেই, শ্লীলতা ও শালীনতা নেই। শুধুমাত্র একজন ব্যক্তিকে খুশী রাখতে সবকিছুতেই তাদের বাড়াবাড়ী ও অতি উৎসাহ।
সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা,
এই হচ্ছে আওয়ামী লীগের গণতন্ত্রের নমূনা। আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রকে কঙ্কালে পরিণত করেছে। গণতন্ত্রশুন্য দেশে প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনকে আটকিয়ে রাখতেই পুলিশকে ক্ষমতাবান করা হয়েছে। আর পুলিশ অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে সরকারের নিষ্ঠুর শাসনের সঙ্গী হিসেবে অমানবিক নিপীড়ণ যন্ত্রে পরিণত হয়েছে।
এটি কোন বিচ্ছিন্ন নৃশংসতা নয়, ৮ই ফেব্রুয়ারীতে সরকার প্রধানের ইচ্ছা পূরণ নিশ্চিত করতে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী বেপরোয়া উন্মত্তায় বিএনপি’র ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। কিন্তু সরকার মনে হয় রায় নির্ধারণ করে রেখেছে বলেই প্রতিক্রিয়ার অজানা আতঙ্কে বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর বুলডোজার চালাচ্ছে।
বন্ধুরা,
গতকাল বিএনপি চেয়ারপার্সনকে অভ্যর্থনা জানাতে অপেক্ষমান জনগণ ও বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সহিংস আক্রমণের পরেও যে দৃঢ় মনোবল প্রদর্শণ করেছে জনগণ ও নেতাকর্মীরা তা নজীরবিহীন। জাতীয়তাবাদী শক্তির প্রতীক জনগণের প্রিয় নেত্রীকে নিয়ে সরকারের দেয়া সাজানো ও ভুয়া মামলার নামে ছিনিমিনি খেলাতে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের আগুন দাউদাউ করে জ্বলছে। এই কারণে জনগণ ও নেতাকর্মীরা তীব্র আবেগে সরকারের পেটোয়া বাহিনীদের নৃশংস আক্রমণ সহ্য করেও প্রিয় নেত্রীকে একনজর দেখার জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়েছিল। এই দৃঢ়তা, এই প্রত্যয়, এই অটুট মনোবল, এই দুর্যোগ-দূর্বিপাককে উপেক্ষা, এই নিষ্ঠুর নির্যাতনকে আলিঙ্গন করার মধ্য দিয়ে প্রমানিত হয়-জাতীয়তাবাদী শক্তিকে নি:শেষ করা যাবে না, জনগণের ভালবাসার নেত্রী, গণতন্ত্র আদায়ের আপোষহীন কান্ডারী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ধ্বংস করা যাবে না। গতকাল যারা শত বাধা বিপত্তি ও পুলিশী হামলা সত্ত্বেও জনগণসহ বিএনপি নেতাকর্মীরা দেশনেত্রীকে অভ্যর্থনা জানাতে যে সাহসিকতা ও দৃঢ় মনোবল দেখিয়েছেন তা সবার জন্য এক অনন্য প্রেরণার উৎস। সুতরাং এটা নিশ্চিত-বর্তমান স্বৈরাচারী দু:শাসনের বন্ধন কেটে গণতন্ত্রের পথে দেশ পা বাড়াবেই। আমি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি’র পক্ষ থেকে গতকাল বিএনপি চেয়ারপার্সনকে অভ্যর্থনা জানাতে অপেক্ষমান জনগণ ও নেতাকর্মীদের আন্তরিক শুভেচ্ছা ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
সাংবাদিক বন্ধুরা,
এ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যমতে যারা গ্রেফতার হয়েছেন সেটির একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র আপনাদের সামনে উপস্থাপন করছি :
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সভাপতি হাবিব উন নবী খান সোহেল সিলেট থেকে ফেরার পর তিনি কোথায় আছেন আমরা এখন পর্যন্ত জানতে পারিনি।
ঢাকা: শাহবাগ থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি ইকবাল হাসান গ্রেফতার।
মৌলভীবাজার: রাজনগর উপজেলা বিএনপি সাধারণ স¤ক্সাদক সুন্দর বকস, প্রচার সম্পাদক জগলুসহ অন্তত ১৪ জন গ্রেফতার।
বগুড়া: সদর উপজেলা বিএনপির সাধাঃ স¤পাদক অ্যাডঃ মাহবুবুল আলম শাহীন, কাহালু উপজেলা বিএনপি’র সিনিয়র যুগ্ম-আহ্বায়ক সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান তোফাজ্জল হোসেন আজাদ, জেলা যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আমিরুল ইসলাম, যুবদল নেতা বাপ্পী, শাহীন শেখ, ছাত্রনেতা সন্ধান, সোনাতলা উপজেলা জোড়গাছা ইউনিয়ন যুবদল নেতা মিলন, বালুয়া ইউনিয়ন বিএনপি নেতা বিটুল ও ফজলু গ্রেফতার।
রাঙ্গামাটি: জেলা বিএনপি সভাপতি শাহ আলম, জেলা বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক শহীদ চৌধুুরী, প্রচার সম্পাদক আবুল হোসেন বালি, জেলা যুবদল সভাপতি সাইফুল ইসলাম শাকিল, সাধারণ সম্পাদক মোঃ ইলিয়াস, জেলা ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক মোঃ কামাল উদ্দিন, জেলা যুবদলের নেতা সাখাওয়াত হোসেন সুজা।
চট্টগ্রাম (দঃ): বাঁশখালী পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ-আল মবিন গ্রেফতার।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলাঃ কসবা উপজেলাধীন খারেরা ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোঃ মিজানুর রহমান,ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আবু হানিফ, কসবা পৌর ছাত্রদলের যুগ্ম আহবায়ক শিমুল, কুঠি ইউনিয়ন ছাত্রদলের নেতা হৃদয়, বাদৈর ইউনিয়ন যুবদলের আহবায়ক কমিটির সদস্য সোহাগ, রমজান, শাফিউদ্দিন, সাদ্দামসহ ৩০ জনের অধিক নেতাকর্মীকে পুলিশ গ্রেফতার করে।
ফেনী জেলাঃ ছাগলনাইয়া উপজেলাধীন ৫নং মহামায়া ইউনিয়ন ছাত্রদলের সহ-সম্পাদক মুন্সি একরামুল হক শাহীন, সদর উপজেলা ছাত্রদল নেতা নুর করিমসহ ৭ জনের অধিক নেতাকর্মী গ্রেফতার।
চট্রগ্রাম মহানগরঃ ইপিজেড থানা বিএনপির সহ-সভাপতি মোঃ শাহজাহানকে বাসায় না পেয়ে তার স্কুল পড়ূয়া ছেলেকে পুলিশ মারধর করতে করতে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়।
ময়মনসিংহ উত্তরঃ ধোবাউড়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি আলহাজ্ব মফিজ উদ্দিনের বাড়ীতে হামলা চালিয়ে তাকে না পেয়ে তার কলেজ পড়ূয়া ছেলে ফরহাদ আল রাজিকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়।
দিনাজপুরঃ  দিনাজপুর জেলা বিএনপি’র আহবায়ক আক্তারুজ্জামানসহ ৩ জনের অধিক নেতাকর্মী গ্রেফতার।
নরসিংদীঃ  রায়পুরা উপজেলা বিএনপি নেতা জালাল উদ্দিন, স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা ফয়েজ উদ্দিন, বিএনপি নেতা রাহাত মিয়া, মোশারফ মিয়া, নেকবুল মিয়া, ওছমান মিয়া, যুবদল নেতা আলমগীরসহ ১৫ জনের অধিক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলাঃ পটিয়া উপজেলায় ৩০ জনের অধিক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার।
গাজীপুর মহানগরের সাধারণ সম্পাদক বাবুল চৌধুরী এবং ঢাকা মহানগর সদস্য আলমগীর গ্রেফতার।
পাবনা জেলাঃ পাবনা জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি মনোয়ার হোসেন শামীম, পাবনা সদর উপজেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক রিহানুল ইসলাম বুলাল এবং পাবনা বেড়া পৌর ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মামুন হোসেন গ্রেফতার।
আগামী ৮ ফেব্রুয়ারী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন বানোয়াট মামলার রায়কে কেন্দ্র করে এ পর্যন্ত সারাদেশে প্রায় ১১ শ’র অধিক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অন্যায়ভাবে যে সকল নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত অসত্য মামলা প্রত্যাহার করে নিঃশর্ত মুক্তির জোর দাবি জানাচ্ছি। পুলিশ ও আওয়ামী সন্ত্রাসীদের নৃশংস হামলায় যে সকল নেতাকর্মী আহত হয়েছেন তাদের সুস্থতা কামনা করছি।
 
ধন্যবাদ সবাইকে। আল্লাহ হাফেজ।