(বিএনপি কমিউনিকেশন) — পুলিশের সহায়তায় ভোটকেন্দ্র দখল, বিএনপি’র এজেন্টদের বের করে দেয়া-মারধর,  ব্যালট পেপার ছিনতাই, নৌকায় একচেটিয়া সীল মারা মুড়িবইসহ ব্যালট উদ্ধার, প্রার্থীদের ক্যাম্প ভাঙচুর, এজেন্টদের মারধর, ও নির্ধারিত সময়ের পরেও কেন্দ্র দখল করে নৌকায় সীল মারার মধ্য দিয়ে মঙ্গলবার, মে ১৪, খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে।  খুলনায় দিনভর পুলিশের সহযোগিতায় ভোট ডাকাতিতে মেতে উঠে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী ও ক্যাডাররা।

জনতার প্রতিরোধে ৪ কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত

আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা গুলি ছুঁড়ে কেন্দ্র দখল করলে কমপক্ষে চারটি কেন্দ্রে উপস্থিত জনতা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এর ফলে এই ‌কেন্দ্রগুলিতে ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়।

কেন্দ্র চারটি হলো – (১) ইকবালনগর সরকারি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্র (পুরুষ), (২) ৩১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয় কেন্দ্র, (৩) ৩০নং ওয়ার্ডের রুপসা হাইস্কুল এবং (৪) রুপসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র।

কুপিয়ে আহত

নগরীর খালিশপুর থানার ১১নং ওয়ার্ডে জামিয়াহ  তৈয়েবাহ নূরানী তালিমুল কোরআন মাদরাসা কেন্দ্র থেকে সিরাজকে কুপিয়ে আহত এবং তার সহোদর আলমকে মারধর করা হয়। তাদেরকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

আগে থেকে সিল মেরে বাক্সে ফেলেছে

নগরীর ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের ডি আলী ইসলামিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়-২৩৭ নম্বর কেন্দ্র পরিদর্শনের সময় অভিযোগ করেন বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী হাসান মেহেদি রেজভী ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর প্রার্থী মাজেদা খাতুন। তারা অভিযোগ করে বলেন  ‘প্রতিপক্ষরা তাদের কর্মীদের ভোট দিতে দিচ্ছে না। আগে থেকেই ব্যালটে সিল মেরে তা বাক্সে ফেলছে। অনেক ভোটার এসেই বিমুখ হয়ে ফিরে এসেছেন।

আপনার ভোট দেয়া হয়ে গেছে

এসময় ভোটার আব্দুস সাত্তার (৫০) সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেন, ‘আমি ভোট দিতে বুথে গেলে তারা পাশের রুমে যেতে বলে। সেখানে গেলে জানানো হয়, আপনার ভোট দেয়া হয়ে গেছে, ব্যালটও শেষ। বাড়ি চলে যান!

নাম বলে দিলে এখানে অনেক সমস্যা হবে

নগরীর ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের হাজী আবদুল মালেক ইসলামিয়া কলেজে জাল ভোট দেয়ার সময় দুজনকে আটক করে পুলিশ। কিন্তু আটককৃতদের নাম ও পরিচয় প্রকাশ করেনি পুলিশ। সেখানে দায়িত্বরত পুলিশের এসআই বোরহান মিয়া সাংবাদিকদের বলেন, অসহায়। আপনাদেরই ভাই ব্রাদার। নাম বলে দিলে এখানে অনেক সমস্যা হবে। এ সময় নির্বাচনে দায়িত্বরত একজন ম্যাজিস্ট্রেট কেন্দ্রে গেলেও গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেননি তিনি।

দুপুর একটায় ব্যালট শেষ

এদিকে আবদুল মালেক ইসলামিয়া কলেজ কেন্দ্রের কয়েকটি গেট বন্ধ করে রাখা হয়েছে। যারা ভোট দিতে আসছেন তাদেরও ফেরত দেয়া হয়েছে ব্যালটের অভাবে। প্রতিটি কেন্দ্রে ভোটারের সংখ্যা অনুযায়ী ব্যালট সরবরাহ করা হলেও এ কেন্দ্রে দুপুর ১টার সময়ই শেষ হয়ে যায় ব্যালট পেপার। একই রকম পরিস্থিতি নগরীর শেরে বাংলা রোড সোনাপোতা স্কুল কেন্দ্রে। সেখানেও দুপুর দেড়টার মধ্যেই শেষ হয়ে যায় সব ব্যালট পেপার। সকালে এ কেন্দ্রের বাইরে বিএনপি প্রার্থীর টেন্ট এর চেয়ার টেবিল ভাঙচুর করা হয়েছিল।

প্রিজাইডিং অফিসারদের বিতাড়ন

৩১ নং ওয়ার্ডের লবণচরা প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে পোলিং এজেন্টদের পাশাপাশি প্রিজাইডিং অফিসারদেরও বের করে দেয় আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেকের সমর্থকরা। তারা বুথের ভেতরে ঢুকে যখন সীল মারছিল তখন প্রিজাইডিং অফিসাররা বাইরে দাঁড়িয়েছিলেন। তারা সাংবাদিকদের বলেন, তাদের বুথ থেকে বের করে দেয়া হয়েছে।  

বিএনপির সহকারী দফতর সম্পাদক শামসুজ্জামান চঞ্চল অভিযোগ করেন, ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে নিরালা স্কুল কেন্দ্রে দুপুর ১২টার পরই ব্যালট শেষ হয়ে গেছে। দুপুর ১টার দিকে নগরীর ৪নং ওয়ার্ডের দক্ষিণ দেয়ানা স্কুল কেন্দ্র আওয়ামী লীগ সমর্থকরা দখল করে নেয়। পরে তারা প্রশাসনের সামনে নৌকা প্রতীকে সীল মারে। ১৪ নং ওয়ার্ডের কাজী আব্দুল বারী স্কুলে ঢুকে দুপুর ২টার দিকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা নৌকা প্রতীকে সীল মারে।

ভোট ছিনতাইয়ের ভূমিকায় আওয়ামী নারী কর্মীরা

মঙ্গলবার দুপুরে ৩১নম্বর ওয়ার্ডের লবণচোরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নৌকা মার্কায় সিল মারার অভিযোগ উঠে আওয়ামী লীগের নারী কর্মীদের বিরুদ্ধে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বেলা একটার দিকে এই কেন্দ্রের একটি বুথে হঠাৎ কয়েকজন নারী ঢুকে সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তার কাছ থেকে ব্যালট পেপার নিয়ে নেন। পরে তারা মেয়র পদে নৌকা ও কাউন্সিলর পদের পছন্দের প্রার্থীর প্রতীকে সিল মেরে ব্যালট বক্স ভরে রেখে চলে যান। ওই কেন্দ্রের প্রিজাইডিং কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানান, ‘কয়েকজন মহিলা বুথে ঢুকে বলেন কেউ কোনো কথা বলবেন না। কিছুক্ষণ পর তারা ব্যালট পেপারে সিল মেরে বাক্সে ভরে চলে গেছেন।

নির্বাচন কর্মকর্তাকে হুমকি

খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে একটি কেন্দ্রে জাল ভোট দিতে বাধা দেয়ার পর একজন সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তাকে ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকরা হুমকি দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ভোট শেষে বাড়ি ফিরলে কী হয় এ নিয়ে শঙ্কিত ওই কর্মকর্তা। রূপসা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের ৫নং বুথের সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তা উজ্জ্বল কুমার পাল এই হুমকি পান। ঘটনার বর্ণনা দিয়ে উজ্জ্বল বলেন, ‘হঠাৎ ৫/৭ জন লোক এসে ব্যালট পেপার কেড়ে নেয়। পরে তারা নৌকায় সিল মারতে গেলে আমি তাতে বাধা দিয়েছি। এমনকি আমি সিল মারা ব্যালট পেপারগুলো বাক্সে ভরতে দেইনি। তারা আমার নাম পরিচয় জেনে গেছে। ভোট শেষ হলে দেখে নেবে বলেছে। আপনাদের মিডিয়ার ভাইদের কাছে সাহায্য সহযোগিতা চাই। মঙ্গলবার বেলা ১১টার সময় ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালনের সময় নৌকার সমর্থকরা তাকে হুমকি দেয় বলে অভিযোগ করেছেন উজ্জ্বল। আমার কাছে থাকা একশ ব্যালট পেপার কেড়ে নেয়া হয়েছিল। যার সিরিয়াল নং ০০৪৫৮৪০১ থেকে ০০৪৫৮৫০১ পর্যন্ত। সেগুলো সিল মেরে বাক্সে দিতে দেইনি। আমি তাদের বাধা দিলে তারা আমাকে দেখে নেয়ার হুমকি দিয়েছে।

দলীয় ক্যাডার নিয়ে জাল ভোটের মহড়ায় খালেক

খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেক যে কেন্দ্রে গেছেন সেই কেন্দ্রেই জাল ভোটের মহোৎসব চলেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তিনি কেন্দ্রে তার দলীয় ক্যাডারদের নিয়ে প্রবেশ করেন। মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে এ সিটিতে ভোট গ্রহণ শুরু হয়। সকাল থেকেই বিভিন্ন কেন্দ্রে ঘুরে ঘুরে ভোট গ্রহণ দেখেন তালুকদার আব্দুল খালেক। অভিযোগ উঠেছে, কেন্দ্রগুলোতে যাওয়ার সময় খালেকের সঙ্গে ৩০/৪০ জনের দলীয় ক্যাডার বাহিনী ছিল। সঙ্গে মিডিয়াও ছিল। কেন্দ্র পরিদর্শন শেষে তিনি বের হয়ে আসলে মিডিয়াও বের হয়ে আসে।

এ সুযোগে পেছনে তার বহর শুরু করে জাল ভোটের মহোৎসব। তালুকদার আব্দুল খালেক দুপুর ২টার দিকে ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের শেখপাড়া বিদ্যুৎ স্কুল কেন্দ্রে যান। সেখান থেকে তিনি বের হয়ে আসলে তার সঙ্গে থাকা বহর জাল ভোট দেয়া শুরু করে। একইভাবে হাতেম আলী স্কুল, ২৫ নম্বর ওয়ার্ডে সিদ্দিকীয়া মাদ্রাসা, ৩১ নম্বর আব্দুল মালেক ইসলামীয়া কলেজ কেন্দ্রে একই ঘটনা ঘটে।

সিল মারা ব্যালটসহ হাতেনাতে ধরলেন মঞ্জু

মঙ্গলবার দুপুরের দিকে রূপসা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ঢুকে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু দেখতে পান নৌকার সমর্থকরা জাল ভোট দেয়ার চেষ্টা করেছে। এ সময় তিনি ১০০ সিল মারা ব্যালট পেপার কেড়ে নেন। পরে প্রিজাইডিং কর্মকর্তা ইবনুর রহমান সেখানে ভোট স্থগিত করেন।

সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার মোশাররফ হোসেন বলেন, অতর্কিত ১০ থেকে ১২ জন লোক রুমে প্রবেশ করে। তার আমার কাছে থাকা একশ’ ব্যালট পেপার কেড়ে নিয়ে নৌকায় সিল মারে। পরে সেটা বাক্সে ভরে চলে যায়। আমি বাধা দিলে তারা আমাকে হুমকি দেয়।

কাউন্সিলর প্রার্থীর এজেন্টকে মারধর

খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) নির্বাচনে ২২ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী মাহবুব কাউসারের এক এজেন্টকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। মারধরের শিকার আহত আলী আকবরকে খুলনা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

মহানগরীর জিলাস্কুল কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ পিকুর সমর্থকরা মঙ্গলবার সকাল ৭টা ৪৫ মিনিটে তাকে মারধর করেছে বলে অভিযোগ করা হয়।

কাউন্সিলর প্রার্থী মাহবুব কাউসার বলেন, আমার এজেন্ট আলী আকবর সকাল ৭টা ৪৫ মিনিটে জিলা স্কুল কেন্দ্রে ঢুকতে গেলে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ পিকুর লোকজন তাকে মারধর করেন। তাকে কেন্দ্রে ঢুকতে বাধা দেন। পরে তাকে উদ্ধার করে খুলনা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে তাকে অপহরণ করা হয়েছে বলে আশঙ্কা করছেন মাহমুদ। সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হুমায়ুন কবীর বলেন, বিষয়টি আমি শুনেছি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

আপনি বয়স্ক মানুষ কষ্ট করে ভোট দেয়া লাগবে না

খুলনা সিটি করপোরেশনের ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের রূপসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের ভোট। এ কেন্দ্রে ভোট দিতে না পারা একজন বয়স্কা  মহিলা হাসিনা বেগম। ভোট দিতে না পারার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি ভোট দিতে কেন্দ্রে ঢুকলে আমাকে ধাক্কা মেরে বের করে দিয়েছে কতগুলো ছেলে। ছেলেগুলো বলেছে, আপনি বয়স্ক মানুষ, কষ্ট করে ভোট দেয়া লাগবে না। আমরাই দিয়ে দিয়েছি।

আরেকজন ভোটার আম্বিয়া ২ নম্বর বুথের ভোটার ছিলেন। তার ভোটার নাম্বার ৪৭২। তিনিও একই ধরনের অভিযোগ করেন। কেন্দ্রের বাইরে একজন বয়স্ক ভোটার নিরস বদনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তার কাছে ভোট দিতে পেরেছেন কি না জানতে চাইলে বললেন, ‘আমাদের ভোট হয়ে গেছে।’

সিল মারতে এত সময় লাগে নাকি

তখন সকাল ১০টা। পুলিশি পাহারায় হইহই করে কেন্দ্র ঢুকলো ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থীর একদল কর্মী। প্রথমেই তারা কয়েকটি বুথ থেকে বের করে দিলেন ভোটার ও অন্যান্য প্রার্থীর পোলিং এজেন্টদের। তারপর প্রিজাইডিং অফিসারের কক্ষ থেকে নিয়ে আসলেন বেশ কয়েকটি নতুন ব্যালট বই। চারটি বুথের প্রতিটিতেই দুই-তিনটি করে নতুন ব্যালট বই নিয়ে ঢুকলেন তারা। এরপর প্রকাশ্যে চালালেন সিল মারার মহোৎসব। দু-চারজন ভোটার নিজেদের ভোট দিতে চাইলে তাদের ধাক্কা মেরে ও ধমক দিয়ে কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয়। এভাবেই চলছিল খুলনা সিটি করপোরেশনের ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের রূপসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের ভোট।

এদিকে সাংবাদিকরা সেখানে ছুটে গেলে কেন্দ্রের গেটে দায়িত্বরত এক পুলিশ সদস্যকে বলতে শোনা গেছে, ‘সিল মারতে এত সময় লাগে নাকি। সাংবাদিকরা এসে পড়েছে।’