—  শওকত মাহমুদ

এখন আর বিশ্বকাপ ফুটবলে ‘ফেয়ার প্লে’ শ্লোগানটি শোনা যায় না। দরকারও নেই। বর্তমান আসরের প্রাথমিক পর্বে ফাউলের ছড়াছড়ি এবং পেনাল্টি না হওয়ার ঘটনা চলমান বৈশ্বিক উত্তেজনা এবং ট্রাম্প-পুতিনদের ব্যাকরণহীন অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্টাইলের কথাই মনে করিয়ে দেয়। সবই স্বাভাবিক এই সময়ের জন্য; যেমনি করে স্বাভাবিক খুলনার পর গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের সাম্প্রতিক নির্বাচন। ২০১৪ থেকে বাংলাদেশে সকল পর্যায়ের নির্বাচনে যা হয়েছে, তার চাইতে একটু বেশিই হয়ে গেছে গত ২৬ জুনে। সরকার ও নির্বাচন কমিশন যা করবে বলে আশংকা ছিল, তাই করেছে। অপরদিকে বিরোধীদল যা ভেবেছিল তাই হয়েছে। পোলিং এজেন্ট ও ধানের শীষের সমর্থকদের দাবড়ে বেড়ানো পুলিশ সফল হয়েছে। পোলিং এজেন্ট তো দূরের কথা ভোটারদেরকেও বিএনপি সাহস দিতে পারেনি ভোট কেন্দ্রে যেতে। আর যারা গেছে নৌকার ব্যাজ লাগিয়ে যেতে হয়েছে।

সরকার ও নির্বাচন কমিশন একই সুরে দাবি করেছে যে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে এবং জনপ্রিয়তার তুল্যদণ্ডে আবারও প্রমাণ হয়েছে আওয়ামী লীগই এক নম্বরে। ভোটকেন্দ্রে লম্বা লাইন ছিল, শান্তির সঙ্গে ভোটাররা ভোট দিতে পেরেছেন। সাংবাদিকেরা ব্যাকুল চিত্তে তাদেরকে জিজ্ঞেস করলে পরম তৃপ্তি নিয়ে লাইনে দাঁড়ানো ভোটাররা সুখের হাসি হেসেছেন। কিন্তু বৈদ্যুতিক গণমাধ্যমের সাংবাদিকেরা প্রচার করতে পারেননি যে ওইসব ভোটারের বুকে নৌকার ব্যাজ ঝুলছে। কেন্দ্রের বাইরে বড় লাইন কিন্তু ভেতরে গড়বড়, ব্যাজহীন ভোটাররা নানা কেন্দ্রে বাধাগ্রস্ত হয়েছেন অথচ ভেতরে ব্যালট পেপারে শাসক দলের সমর্থকেরা নিশ্চুপ প্রিসাইডিং-পোলিং অফিসারদের সামনে সীল মেরে চলেছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সাংবাদিকেরা নৌকার ‘সন্ত্রাসীদের’ দ্বারা ঘেরাও হয়েছে পড়েছিলেন। যেমন মীর্জা ইব্রাহীম মেমোরিয়াল কলেজে। আবার ঢাকায় টিভি স্টেশনগুলোর কর্তাব্যক্তিরা মাঠের সত্য প্রচার করতে সাহস পাননি। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ফোন এবং খুলনার নির্বাচনে অনিয়মের লাইভ সম্প্রচার করে দু’টি স্টেশনের দুই সাংবাদিকের চাকরি খোয়ানো এবং যথেষ্ট তদবিরের পর চাকরি ফিরে পাওয়ার স্মৃতিটা এখনও তাদের মধ্যে জীয়ল।

পর্যবেক্ষণকারীদের সংস্থা ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপ গাজীপুরে ৪৬ দশমিক ৫টি কেন্দ্রে ১৩৯ ধরনের অনিয়ম প্রত্যক্ষ করেছেন। মার্কিন রাষ্ট্রদূত উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, স্থানীয় সংস্থার এই ভোট leading indicator to national poll। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী এর পাল্টা জবাবে হুশিয়ারি দিয়েছেন যে, এমন কিছু বলবেন না, যাতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নষ্ট হয়। রফিকুল ইসলাম নামে একজন নির্বাচন কমিশনার রাজশাহীতে এক অনুষ্ঠানে বলে বসেছেন, মার্কিন রাষ্ট্রদূতের নাকি অধিকার নেই এমন কথা বলার। প্রধানমন্ত্রীর মিডিয়া উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী ৩০ জুন রাতে ‘নিউজ টুয়েন্টিফোর’ এর টক শো’তে বললেন,‘এটা কূটনৈতিক শিষ্টাচার বহির্ভূত।’ আসলে ফ্যাসিবাদের সংক্রমণ মহামারী আকারে শুরু হয়েছে।

মূলত: পুলিশই ছিল গাজীপুর নির্বাচনে সরকারের চালিকাশক্তি। নির্বাচন পরিচালনাকারী স্থানীয় এসপিকে দায়িত্বে রাখাটা আওয়ামী লীগের জন্য মূল কর্তব্য ছিল। তিনি সুযোগ্য প্রতিদানও দিয়েছেন। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নির্বাচনী অনিয়ম ঘটাতে দক্ষ গোপালগঞ্জের অফিসারদের সমাবেশ ঘটানো হয়েছিল সেখানে। তারা সাদা পোশাকে সশস্ত্র অবস্থায় পোলিং এজেন্ট ও বিএনপি সমর্থকদের মধ্যে যথেষ্ট ত্রাস সৃষ্টি করে। আটক করা ব্যক্তিদের থানায় নয় বরং পুলিশ লাইনের কোথাও রাখা হয়েছিল। তাদের আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে ক্রসফায়ারের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। নির্বাচনী বিধি-বিধান লংঘনে আওয়ামী লীগের কর্তাব্যক্তিরা নির্বাচন কমিশনকে থোড়াই কেয়ার করেছে। ভোটের একদিন আগে উচ্চ আদালত ও কমিশন গণগ্রেফতারের বিরুদ্ধে যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল তাও পুলিশ মানেনি। তাতে কি হয়েছে?

শাসক দলের একজন নেতা আমাকে বলেছেন, গাজীপুরে আওয়ামী লীগের নমিনেশন নিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাহাঙ্গীরের বড় দূরত্ব ছিল। প্রথমে আওয়ামী লীগ নামেনি বলে ভোট স্থগিত করা হয়। শেষে কেন্দ্রীয় চাপে কিছুটা মিল হয়। সে জন্য পুলিশের ওপর আওয়ামী লীগ প্রার্থীর নির্ভরতা ছিল পর্বত প্রমাণ এবং প্রার্থী নিজেই বলে ফেলেছিলেন যে তিনি ভাবতেই পারেন না যে তিনি হারবেন। জনান্তিকে চাউর আছে, ওবায়দুল কাদের এই নমিনেশনের ব্যাপারে জেদী ছিলেন। তাঁকে আওয়ামী লীগের এক সিনিয়র নেতা বলেছিলেন, যদি কারচুপি করেই জেতাতে হয় তাহলে আযমতউল্লার মতো পরীক্ষিত আওয়ামী লীগ নেতা নয় কেন?” একদিন হয়তো এমন সময় আসবে, সেদিন মানুষ পুলিশমুক্ত নির্বাচন চাইবে।

অন্যদিকে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হাসানউদ্দিন সরকার ব্যক্তিগত জনসমর্থন ও দলীয় জনপ্রিয়তায় অনেক এগিয়ে ছিলেন। দলের কেন্দ্রীয় নেতারাও প্রচারে যথেষ্ট কাজ করেছেন। কিন্তু ভোট ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, পরিচালনা কমিটিতে মহানগর নেতৃবৃন্দের কম সম্পৃক্ততা (মহানগর কমিটি এখনও নেই), বহিরাগত বলে শেষ আড়াই দিন পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বাধ্যতামূলক অনুপস্থিতি, অর্থ সংকট এবং সাবেক মেয়র মান্নান সমর্থকদের একাংশকে ঐক্যবদ্ধ করতে না পারার ব্যর্থতাগুলো এখন আলোচিত হচ্ছে।

খুলনা ও গাজীপুর নির্বাচন নিয়ে পর্যবেক্ষকেরা এমন মতে উপনীত হতে পারেন যে, বর্তমান সরকারের অধীনে ভবিষ্যতে স্থানীয় ও জাতীয় যতো নির্বাচন হবে সে সবের মডেল হবে নিম্নরূপ ১. নির্বাচন কমিশন থাকবে নিশ্চুপ, প্রতিক্রিয়াহীন, ২. পুলিশ হবে ভোটের সর্বাত্মক পেশিশক্তি, ৩. বিরোধী দলের প্রার্থী না থাকাই ভালো এবং থাকলে তার পোলিং এজেন্টেরা কেন্দ্রে যেতে পারবেন না, ৪. শুধু নৌকার ব্যাজ লাগানো ভোটাররা ভোট দিতে পারবেন। গাজীপুরে ধানের শীষ যে সোয়া লাখ ভোট পেয়েছে, তার পুনঃগণনা চাওয়া উচিত ছিল। কেননা এতো ব্যালটে ধানের শীর্ষের ছাপ্পা আছে কিনা সন্দেহ, বরং সাজানো ফলাফল বানাতে গিয়ে অনেক সময় লেগে গেছে, ৫. সাংবাদিকেরা কোন অনিয়ম দেখতে পারবেন না, লেখা বা প্রচার করা তো দূরের ব্যাপার। শুধু প্রচার হবে জোটের লম্বা লাইন এবং কৃত্রিম উৎসবের দৃশ্যবলী। গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে এমন অনুরোধ এসেছে, ‘শুধু দেখবেন, দেখাবেন না।’

এই ভোটের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ তাদের বার্তা স্পষ্ট করেছে যে, কোনও পরিস্থিতিতেই নির্বাচন বা বিরোধী দলের ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র সহনশীল হবে না। জিরো টলারেন্স। একটি নির্বাচনকেও কারচুপিমুক্ত করবে না। বিএনপি’র সঙ্গে সংলাপ নাকচ করে দিয়েছে ক্ষমতাসীন দল। কিন্তু প্রশ্ন হল, তারা কি এ অবস্থা ধরে রাখতে পারবে? খুলনা, গাজীপুর, সিলেট, বরিশাল, রাজশাহী- সব তার চাই। কাদেরকে দেখাতে চাইছে যে উন্নয়নের প্রতি মানুষ ব্যাপকভাবে সমর্থনশীল হয়ে পড়ছে। দেখাতে চাইছে দেশে দল একটাই, নেত্রী একজনই। সম্প্রতি ভারতের পশ্চিমবঙ্গে যে ও তাদের করা পঞ্চায়েত নির্বাচন হয়ে গেল তাতে মমতা ব্যানার্জীর তৃণমূল কংগ্রেস জয়ী হয়েছে। দলটি এই বদনামও কুড়িয়েছে যে সেখানে কোনও বিরোধী দল ৩৭ ভাগ আসনে গায়ের জোরে কোন প্রার্থীই দিতে দেয়নি। কলকাতা হাইকোর্ট অবশ্য এটা ভাল করে ধরেছে। ঝুলিয়ে রেখেছে ফলাফল। এ প্রসঙ্গে ২ জুন সাময়িকী ‘দেশ’ সংখ্যায় “অদ্ভূত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া” শিরোনামে নিবন্ধ একটা প্রাসঙ্গিক মন্তব্য করেছে – সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ভাবনা নেই, ভাবনা হলো বিরোধীশূন্য করে দেওয়া যাবে কিনা গোটা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। কিন্তু শাসকদল ভুলে গেছে উন্নয়নের প্রমাণ হিসেবে বিরোধী দলকে ‘হাওয়া’ করে দেওয়াটা গণতন্ত্রের পরিপন্থী। উন্নয়ন করলেই যে ভোটে জেতা যাবে এমন নয়…… যে জঙ্গলমহল নাকি তৃণমূল রাজত্বে উন্নয়নের কাতুকুতুকে খিলখিল করে হাসছিল, সেখানে বিজেপি প্রচুর আসন পেয়েছে। উন্নয়ন করলেই ক্ষমতাসীন সরকারকে চিরকাল ভোট লুঠ করে জিততে হবে, এমন উপপাদ্য রাজনীতির অংকে কেউ প্রমাণ করে যাননি। মাঠে ঘাটে রাজনীতি করেন বলে যারা দাবী করেন, আত্মশ্লাঘা অনুভব করেন, দেশটাকে তাঁদের মতো করে রাজনীতিবিদেরাই মাঠঘাট করে রেখেছেন।

কোন কোন পর্যবেক্ষক মনে করেন, সরকারের “সব কিছু আমার” পরিকল্পনা জনমনে অন্য রকম প্রশ্ন জাগিয়ে তুলেছে-জোর করে জেতার বেশরম প্রক্রিয়া কেন? আর কতোদিন? সরকারের উচ্চপদে নিয়োগ হোক, স্থানীয় সরকারের ভোট হোক, সে ক্ষেত্রে আনুগত্যই হয়ে উঠেছে প্রধান মানদ-। কেন? নাকি জাতীয় নির্বাচনের আগে বর্তমান সরকার বিদায় নিলেও যেন এসব পকেটে বিশ্বস্ত লোক থাকে!

অন্যদিকে বিএনপি’র মধ্যে গাজীপুর নির্বাচনোত্তর এক নতুন ভাবনা শুরু হয়েছে। বিএনপি নেতাদের বুঝ হয়েছে এভাবে নির্বাচনে গিয়ে আসলেই লাভ নেই। কিন্তু আবার ছেড়েও আসতে পারছে না। অন্তত: আরও এক মাস কম ঝামেলায় মিডিয়াতে নির্বাচনী তৎপরতার নামে কম পুলিশী বাধায় বিএনপি জেগে থাকবে। সরকারের কর্কশ দিকগুলো আরও তুলে ধরতে পারবে। এরমধ্যেই বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টা পরিষ্কার হবে। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেছেন, বাকী তিন সিটির ভোট দেখে সিদ্ধান্ত হবে জাতীয় ডিসেম্বরের জাতীয় ভোটে বিএনপি যাবে কিনা। অবশ্য এরমধ্যে বিএনপি বৃহত্তর একটা রাজনেতিক ঐক্য গড়ার চেষ্টা করছে। কমন ইস্যু হতে পারে শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রিত্বের অবসান ঘটানো। শুধু সংসদ বাতিলের আন্দোলন করলে আওয়ামী লীগ বলতে পারে যে সংসদীয় গণতন্ত্রের নিয়ম অনুযায়ী পদত্যাগ করলেও শেষ সংসদের প্রধানমন্ত্রী অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট শেখ হাসিনার অধীনে ভোটে যাবে না। আবার ভোটটা অন্তর্ভুক্তিমুলক না করে বসেও থাকবে না। কেননা পুরোপুরি আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন নেই বলে আওয়ামী লীগ জোর-জবরদস্তির এক তরফা নির্বাচনে যেতে চাইছে।

  • লেখক বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির ভাইসচেয়ারম্যান ও নন্দিত সাংবাদিক নেতা।