(বিএনপি কমিউনিকেশন) —   অলিখিত বাকশাল ও একদলীয় শাসন পাকাপোক্ত করতেই সরকার তড়িঘড়ি করে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮’ পাশ করেছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

তিনি বলেন, বর্তমান সংসদের বৈধতা নেই তাই জনগণ এ আইন মানে না। সোমবার, অক্টোবর ৮, রাজধানীর গুলশানের লেকশোর হোটেল এর হলরুমে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

সভায় বিএনপি কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও কূটনীতিকরা অংশ নেন। কূটনীতিকদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, রাশিয়া, তুরস্ক, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান ও আফগানিস্থানের প্রতিনিধি ছিলেন।

মির্জা ফখরুল বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাশ নিয়ে সাংবাদিক থেকে শুরু করে সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। দেশে যে কর্তৃত্ববাদী শাসন চলছে, তার চূড়ান্ত প্রতিষ্ঠার সকল আয়োজন সম্পন্ন করা হয়েছে। বিএনপি মহাসচিব বলেন, আমরা যে স্বপ্ন দেখেছিলাম মুক্তিযুদ্ধে সেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সম্পূর্ণভাবে ধূলিস্যাৎ করে দেয়া হচ্ছে৷ গণতান্ত্রিক, মুক্ত স্বাধীন দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ভেঙে ফেলা হচ্ছে৷ আমরা অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে লক্ষ্য করছি বহু মত, বহু পথ, ভিন্ন মতের ব্যবস্থাকে পুরোপুরি শেষ করে দিয়ে একটি দলের শাসন বাস্তবায়নের যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে৷ জনগণের আকাঙ্খা ধ্বংস করা হচ্ছে৷ এভাবে চলতে দেয়া যায় না।

দেশের সকল মানুষকে এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। তিনি বলেন, আমরা এই আইন মানি না। অবৈধ সংসদে এই আইনটি পাস হয়েছে। কোন ধরনের আলোচনা ছাড়াই তা পাশ হয়েছে। সম্পাদকমণ্ডলীকে কথা দেয়া হয়েছিল আলোচনার। কিন্তু এই প্রতারক সরকার কথা রাখেনি। জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে।

ফখরুল বলেন, এখনও সময় আছে, অবিলম্বে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করুন। একমাত্র খালেদা জিয়াই এই পরিস্থিতি থেকে জাতিকে মুক্ত করতে পারেন। তাকে মুক্ত করুন, কিভাবে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা করা যায় তার ব্যবস্থা করুন। মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে সাময়িক দেশ শাসন করা যায়, দীর্ঘদিন করা যায় না। তিনি আরো বলেন, ঐক্যবদ্ধ হওয়ার কাজ শুরু করেছি। আমরা ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আগেই জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়ে আছে। শুধু আমরা নয় অন্যান্য সকল রাজনৈতিক দলগুলোও আজ ঐক্যবদ্ধ।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকে কালো আইন উল্লেখ করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পূর্ণ প্রহসনমূলক করতে সরকার সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করে এগিয়ে যাচ্ছে। এমন একটি কালো আইন এ কারণেই বাস্তবায়ন করতে হলো। এই আইনটি অলিখিত বাকশাল প্রতিষ্ঠা, নিজেদের সুরক্ষার আইন। বাকশাল কিন্তু টিকেনি। সরকারের সময় শেষ হয়ে গেছে। বাকশাল করেও যেমন ক্ষমতা পাকাপোক্ত হতে পারেনি, অলিখিত বাকশালের পরি্ণতিও ভালো হবে না।

স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, আন্তর্জাতিক সংগঠন, দেশ এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন বিরোধিতা করা সত্ত্বেও রাষ্ট্রপতির দস্তখত হয়ে গেল। আজকে বিরোধী মতসহ সাংবাদিক সমাজকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, এটা একটা কালো আইন।

স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, নির্বাচনী প্রকল্পের অংশ হিসেবে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। জনগণের মৌলিক অধিকার যা সংবিধানে বলা হয়েছে তা হরণ করা হচ্ছে। এ আইনের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সভাপতি রুহুল আমিন গাজী বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ এর মাধ্যমে শুধুমাত্র সাংবাদিক নয় দেশের ১৬ কোটি মানুষের অধিকারকে হরণ করা হয়েছে। যতক্ষণ না আইন পরিবর্তন করা হবে আমরা আন্দোলন করে যাব।

দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার সম্পাদক আলমগীর মহিউদ্দিন বলেন, নিরবিচ্ছিন্নভাবে ক্ষমতায় থাকতে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮’ বাস্তবায়ন করা হলো। এ আইনের ফলে এমনও হতে পারে গোপনে কথা বলাও বন্ধ হয়ে যাবে।

মতবিনিময় সভায় কী-নোট নিবন্ধ উপস্থাপন করেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শওকত মাহমুদ। তিনি বলেন, বিনা ভোটের সরকার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ বিনা বিবেচনায় সংসদে পাস করিয়ে নিয়েছে। এই আইন মুক্ত চিন্তা পোষণ, বিনিময় এবং তথ্য ও মত প্রকাশের অধিকারকে চেপে ধরার বলদর্পী প্রয়াস। আলোচিত এই আইনটি সম্পর্কে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় মানবাধিকার ও সাংবাদিক সংগঠন, সুজন, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন উদ্বেগ প্রকাশ করে সংশোধন চেয়েছে।

তিনি বলেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের আগে এমন আইন দরকারি হয়ে উঠলো কেন? এমন প্রশ্ন তুলে শওকত মাহমুদ বলেন, ২০১৪ সালের একতরফা বিতর্কিত নির্বাচনের আগে তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার সংশোধন ঘটানো হয়েছিল। গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণে রেখে সরকার ২০১৪ এর মতো আরেকটি সংসদ নির্বাচনের পথে হাঁটছে কিনা সংশয় দেখা দিয়েছে।

অনুষ্ঠানে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, রুহুল আলম চৌধুরী,মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ডাঃ জাফর উল্লাহ চৌধুরী, সৈয়দ কামাল উদ্দিন আহমেদ, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদ, নয়াদিগন্ত সম্পাদক আলমগীর মহিউদ্দিন, দৈনিক বাংলাদেশ খবরের উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ,শীর্ষ নিউজ সম্পাদক একরামুল হক, বিএফইউজে সভাপতি রুহুল আমিন গাজী, মহাসচিব এম আবদুল্লাহ, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি কাদের গনি চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমেদ, যুগ্ম সম্পাদক ইলিয়াস খান,ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের চীফ নিউজ এডিটর আশিষ সৈকত, ইনকিলাবের বিশেষ প্রতিনিধি রেজাউর রহমান সোহাগ,লেখক, কলামিস্ট হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ, এস এ টিভির বিশেষ প্রতিনিধি ইলিয়াস হোসেন, সমকালের চীফ রিপোর্টার লোটন একরাম,সাংবাদিক সাঈদ আহমেদ খান, মেহেদী হাসান পলাশ, ইনামুল হক শামীম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড.মামুন আহমেদসহ বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা বক্তব্য রাখেন।